বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী ও একাত্তরে খুন-রাহাজানি-লুঠতরাজ ও ধর্ষকের দল হিসেবে কুখ্যাতি পাওয়া জামায়াতে ইসলামী আবারো হুংকার দিয়ে দেশকে তাদের আধিপত্য বজায় রাখার ষড়যন্ত্রে নেমেছে।
এরই মধ্যে তাদের কয়েকজন কুখ্যাত নেতা নানা ধরনের হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করে নতুন করে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিতে চাইছে। আর এসবই করছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার জন্য।
কারণ এরই মধ্যে তারা সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন স্থানে তাদের লোকজন বসিয়ে দিয়েছে। ফলে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপিকেও তারা রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে।
বিএনপি কি আসলে এই মানবতাবিরোধী অপশক্তিকে সামাল দিয়ে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে সেটাই এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কারণ সেই ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টের কথিত গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি জামায়াত একসঙ্গে আন্দোলন করলেও পরে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। সেই বিরোধ ক্রমান্বয়ে বেশ দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
জাতীয় সংসদেও এই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতকে নিষিদ্ধের দাব উঠেছে। তবে বিএনপি’র নীতি নির্ধারনী পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে তেমন কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হয়তো বিএনপি’র মধ্যে একধরনের ভীতি কাজ করছে যে, যদি তারা খুব বেশি করে জামায়াত-শিবির ও ইসলামী উগ্রপন্থী দলগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করে তাহলে তাদের রাজনৈতিক মিত্র দূর্বল হয়ে পড়বে।
আর তা হলে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগ আবার আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাধারন জনগণকে সাথে নিয়ে নতুন করে শক্তিশালী হয়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলতে পারে।
এরই মধ্যে ২৮ জুন ভারতের এনডিটিভি’র এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন- “এ বছরই দেশে ফিরব”। এতদিন বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা বললেও সময় সম্পর্কে কিছু বলেননি।
কিন্তু হঠাৎ করে ভারতের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভিকে একই মেইল সাক্ষাৎকারে এ বছরই দেশে ফেরার কথা বলায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে।

ওই টিভির এক প্রশ্নোত্তরে আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এখনকার বিএনপি সরকারের সঙ্গে ‘গোপন আলোচনা’ চলছে কি না এমন প্রশ্নে বলেন, আওয়ামী লীগ কারও কাছে ‘দয়া ভিক্ষা করে না’; তবে তিনি ‘রাজনৈতিক সমাধানের’ পক্ষে।
তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরে এরই মধ্যে সেই একাত্তরের ঘাতকের দল জামায়াতে ইসলামীর পেটকামড়ানি শুরু হয়ে গেছে।বলা চলে হৃদকম্পনও দেখা দিয়েছে।
আবার বিএনপি’রও যে অবস্থা এখনকার বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বলয়ে সেক্ষেত্রে বিএনপিও অনেকটা ভয়ে ভয়ে আছে।
কারণ একদিকে দেশের ভেতরে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠীর আস্ফালন; অন্যদিকে শত নির্যাতনের মুখেও আওয়ামী নেতাকর্মীরা দমে যায়নি।
প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ‘ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে, শেখ হাসিনার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই’- এ ধরনের শ্লোগানে শ্লোগানে রাজপথ ও আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে।

এমনই অবস্থার মধ্যে একাত্তরের কুখ্যাত খুনী, ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী ( যদিও অবৈধ ইউনুস সরকারের সময় আদালতের অবৈধ রায়ে খালাসপ্রাপ্ত)এ টি এম আজহারুল ইসলাম বিএনপি সরকারকে অনেকটা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন।

জাতীয় সংসদে বাজেট নিয়ে যে আলোচনা চলছে সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর আজহার প্রশ্ন তুলেছেন- জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে সরকার একদলীয় শাসন কায়েম করতে চায় নাকি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চায় ?
রবিবার ২৮ জুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি। জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করলে সেই শূন্যস্থান কে পূরণ করবে এমন প্রশ্নও করেন তিনি।

বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে জামায়াত নেতা বলেন, “আপনারা জামায়াতকে নিষিদ্ধের কথা বলেছেন। আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই, ধরলাম আমরা নিষিদ্ধ হয়ে গেলাম। এই শূন্যস্থানটা পূরণ করবে কে? আপনারা কি একাই দেশ চালাবেন? আপনারা কী একদলীয় শাসন কায়েম করাবেন? যদি না করেন, এটা কে পূরণ করবে?”
একইসঙ্গে বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগকে ফেরাতে চায় মনে হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। “আপনারা কী আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন? আমি তো মনে করি, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন।
কারণ চার মাসেও একটা লোক খুঁজে পেলেন না যে, প্রেসিডেন্ট কে হবে? ফ্যাসিস্ট সরকারের লোককেই আপনাদের পছন্দ হয়। তাকেই রাখার চেষ্টা করতেছেন।”
জামায়াতের এই নেতা সংসদে বলেন, ফ্যাসিস্টদের নির্মূল করতে হলে তাদের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে।
পাঠকদের একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই – জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, হত্যা ও ধর্ষণের ছয়টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল।

পরবর্তীতে আইসিটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, সুপ্রীম কোর্টের আপীলেট ডিভিশনও তা বহাল রেখেছিল। কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকার অধিকতর স্বচ্ছতা দেখাতে গিয়ে এই খুনীর ফাঁসির রায় বাস্তবায়নে দেরি করায় আজ সে আস্ফালন করার সুযোগ ও সাহস পাচ্ছে।
এই খুনী আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রধান যে কয়টি গুরুতর অভিযোগ ছিল সেগুলো হলো—
১) রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় (যেমন বদরগঞ্জ) ব্যাপক গণহত্যা চালানো এবং শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যা।
২) ১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল রংপুর কারমাইকেল কলেজের চারজন হিন্দু অধ্যাপক ও একজন অধ্যাপকের স্ত্রীকে অপহরণের পর হত্যার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা।
৩) রংপুর টাউন হলে নারীদের আটকে রেখে নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা।
৪) এছাড়াও তার বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ ছিল।
২০১২ সালে ২২ আগস্ট তাকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে আনা মোট ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় রায় ঘোষণা করেন।
৩টি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) দেওয়া হয়। এর মধ্যে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক ও তাদের পরিবারকে হত্যার অভিযোগ এবং বদরগঞ্জের গণহত্যার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১টি অভিযোগে ২৫ বছর কারাদণ্ড ও
১টি অভিযোগে ৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও, ২০২২ ও ২০২৪ সালের আইনি পর্যালোচনার ভিত্তিতে ২৭ মে ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এ টি এম আজহারুল ইসলামকে সকল অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ খালাস প্রদান করেন এবং তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়।
অবশ্য তখন অবৈধ ইউনুস সরকারের আমলে জামায়াতে ইসলামী তখনকার তাবেদার কোর্টে তাদের অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে খালাসের রায় বের করে নেয়।
এই আজহারুল ইসলাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের রংপুর শাখার সভাপতি এবং রংপুর জেলার আল বদর বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। বাংলাদেশে তিনি নবগঠিত বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখার প্রথম সভাপতি ছিলেন।
বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পেয়ে সংসদে ও সংসদের বাইরে রাজনীতিতে আস্ফালন করে বেড়াচ্ছেন।
প্রসঙ্গত গত ২২ জুন স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে সংসদে দাবি তোলেন ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম (জামাল)।
তিনি অবশ্য প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নাম না নিয়ে দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি সংসদে তুলেছেন তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা কোনো দলের এ দেশে রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিত নয়।
জামায়াতের প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদে আসা রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, ‘আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, নামের পরে ইসলাম থাকলেই ইসলাম হয় না। যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে, গত নির্বাচনে ভোটের বিনিময়ে মানুষকে বেহেশ্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা দেখেছি, বিড়ির সুখটানের মধ্য দিয়েও তারা বলেছিল সব পাপ মওকুফ হয়ে যাবে।’
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এভাবে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করছে, এই দলটি ১৯৭১ সালে এ দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। যে দলটি বাংলাদেশের সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল, আমি মহান সংসদে দাবি করব, তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে না, তাদের রাজনীতিও ফ্যাসিস্টদের মতো নিষিদ্ধ করা হোক।’
এরই মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে অংশ নেয় একসময়ের জোটবদ্ধ দল বিএনপি ও জামায়াত। নির্বাচনী প্রচারে বিএনপির নেতারা ১৯৭১ সালে জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান সামনে এনেছিলেন।
একই দিন অর্থাৎ গত ২২ জুন সংসদে কুষ্টিয়া-১ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ মসজিদে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘আমি একটি রাজনৈতিক দলের কথা বলতে চাই। আমার দেশে মসজিদের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। মসজিদ আল্লাহর ঘর। মসজিদে নামাজ পড়বে, মসজিদে কোরআন শরিফ পড়বে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল মসজিদে গিয়ে রাজনীতি করে।’
জামায়াতকে ইঙ্গিত করে এ কথা বলার পর রেজা আহমেদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করব আইন পাস করার জন্য, যাতে কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসায় রাজনৈতিক মিটিং করা না যায়। আমরা যেমন ফুটবল মাঠ, হাইস্কুল বা হলরুমে কর্মিসভা, জনসভা ও মিটিং করি, তাদেরও সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তারা মসজিদে মিটিং করতে পারবে না। আমার সঙ্গে সবাই একমত কি না জানি না।’
বিএনপি’র কয়েকজন সাংসদ জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে এমন দাবি করার পরও কিন্তু বিএনপির নীতিনির্ধারনী পর্যায় থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কারন বিএনপি কোনভাবেই তাদের একসময়কার রাজনৈতিক মিত্র এমনকি জানি দোস্ত জামায়াতকে খুব বেশি বেকায়দায় ফেলতে চায়না।
কারণ বিএনপি জানে যে জামায়াতকে বেশি ঘাঁটালে তাদেরও সমস্যা হবে। কারণ একে অপরের হাঁড়ির খবর বেশ ভালো করেই জানে।
তাই নিজেরা ( বিএনপি-জামায়াত) যদি বেশি বিরোধে জড়িয়ে পেড়ে তাহলে আওয়ামীলীগ মাঝখান থেকে সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে চলে আসতে পারে। মূলত সে ভয়ে তেমন কিছু করতে চাইছেনা বিএনপি।
# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।
