একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিল্পায়ন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান মূলত নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-জ্বালানী তেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর।

বর্তমানে বাংলাদেশে এই এনার্জি সেক্টরের চরম বিপর্যয় পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রবাদ রয়েছে— “ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই”।

দেশের বর্তমান সরকার তথা বিএনপির নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের ক্ষেত্রে এই লোকজ প্রবাদটি আজ রূঢ় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। দেশের এই দুরাবস্থায় সাধারণ নাগরিকরা অনেক আগে থেকেই বলতে শুরু করেছেন বিএনপি ক্ষমতায় মানেই বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানী সংকট হবে।

একদিকে যখন গ্যাস, তেল ও বিদ্যুতের অভাবে দেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে এবং শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; তখন সরকার সংকটের টেকসই সমাধান না করে উল্টো সমালোচনা দমন করতে মরিয়া। ক্ষুব্ধ ও সমালোচনাকারী এক সাধারণ যুবককে গ্রেপ্তার তারই প্রমাণ।

অন্যদিকে, রাজপথে “গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে” স্লোগানে জামায়াতসহ বিভিন্ন বিরোধী দল তীব্র আন্দোলন ও মিছিল করলেও তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে সরকার দৃশ্যত ব্যর্থ।

 

এই বহুমুখী রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং চরম অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অব্যবস্থাপনা দেশের ভবিষ্যৎকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান চিত্রবর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র দৈনিক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এখন অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের চাপ এত নিচে নেমে গেছে যে, সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না যেমন বন্ধ, ঠিক তেমনি সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দিয়েও মিলছে না গ্যাস।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের এই ভয়াবহতা শুধু প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং সরকারের ভুল নীতি, সংস্কারের অভাব, বিদায় সুদখোর মহাজন ইউনুস নেতৃত্বাধীন ইন্টেরিম সরকারে চরম অব্যবস্থাপনা-খামখেয়ালী-দূর্নীতি ইত্যাদিও সমানভাবে দায়ী।

ইউনুসীয় ও বর্তমান প্রশাসনের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার ফল ভোগ করছে এখন দেশবাসী। । ২০২৪ এর শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পর থেকে ২০২৬ সালের এই দীর্ঘ সময়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি তো হয়নি, উল্টো ডলার সংকট এবং বৈদেশিক বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বা জ্বালানি আমদানি করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

রপ্তানী পোশাক ও ওষুধ শিল্প খাতের বন্ধ প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান ও আর্থিক ক্ষতিবিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের সবচেয়ে মারাত্মক ও সরাসরি আঘাতটি এসেছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শিল্প খাতের ওপর।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক এবং দেশের অন্যতম শীর্ষ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ শিল্প খাত আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সরকারিভাবে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৩ বছরে (জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত) বাংলাদেশে ৪০২টি তৈরি পোশাক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

এর মধ্যে পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’ র ২৮২টি এবং নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’ র ১২০টি কারখানা রয়েছে। তীব্র গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অধিকাংশ চালু কারখানা তাদের সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।

এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিগত কয়েক মাসে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় পশ্চিমা ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি আদেশ বাতিল করেছে, যা পুরো তৈরি পোশাক খাতে বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি ডেকে এনেছে।

উৎপাদন হ্রাস এবং বিকল্প হিসেবে নিজস্ব জেনারেটর চালাতে গিয়ে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের উচ্চ মূল্যের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ।

একই সাথে, কারখানা বন্ধের কারণে এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১ লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন, যা দেশের বেকারত্ব সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। ওষুধ শিল্প খাতের অবস্থাও সমান উদ্বেগজনক।

জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও প্যারাসিটামলের কাঁচামাল বা এপিআই (API) উৎপাদনকারী কারখানাগুলো গ্যাসের চাপের অভাবে বয়লার চালাতে না পেরে শতভাগ উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের বৃহত্তম এপিআই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যেমন গণস্বাস্থ্য বেসিক কেমিক্যাল লিমিটেড সহ বেশ কয়েকটি বড় ইউনিটের উৎপাদন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (BAPI) তথ্য অনুযায়ী, কারখানা থেকে ওষুধ সরবরাহ ডিপো এবং খুচরা বাজারে পৌঁছানোর জন্য পরিবহন জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

ওষুধ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ও আংশিক অচল থাকার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এই স্থবিরতার কারণে ওষুধ খাতে শত শত কোটি টাকার আর্থিক লোকসান হচ্ছে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় হচ্ছে।

বৈদেশিক রপ্তানি খাতের বিপর্যয় ও ওষুধ সংকট তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। যেহেতু দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, তাই এই খাতে ধস নামায় সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে।

প্রতি মাসে রপ্তানি আয় ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।

ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো এলসি বা ঋণপত্র খুলতে পারছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ওষুধ শিল্পে। ওষুধের কাঁচামাল আমদানির এলসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক, ইনসুলিন, ক্যানসারের ওষুধ এবং হৃদরোগের ওষুধের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ওষুধের এই হাহাকার দেশের জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তাকে এক চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।

আঞ্চলিক বিদ্যুৎ আমদানি ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা অভ্যন্তরীণ ঘাটতি পূরণের জন্য নেপাল ও ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির যে বড় বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা বর্তমানে গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

ভারতের আদানি পাওয়ার কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী শত শত মিলিয়ন ডলার বকেয়া পড়ে রয়েছে। ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশ সময়মতো এই অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে সরবরাহকারী দেশগুলো বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধের হুমকি দিচ্ছে।

অন্যদিকে নেপাল থেকে ভারতের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির জটিলতা নিরসনে বর্তমান বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা স্পষ্ট। ফলস্বরূপ, আমদানির ওপর ভরসা করে বিদ্যুৎ সংকট দূর করার আশার বাণী এখন পুরোপুরি অসার প্রমাণিত হয়েছে।

হাসপাতালে মানবিক বিপর্যয় ও অপারেশন বন্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত, মানে অপরাবেশন যখন করার কথা তখন করতে পারছেন না চিকিৎসকগন বিদ্যুতের অভাবে।

চিত্রবিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং হৃদয়বিদারক রূপটি দেখা যাচ্ছে দেশের চিকিৎসা খাতে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো আজ অন্ধকূপে পরিণত হয়েছে।

জেনারেটর চালানোর মতো পর্যাপ্ত তেল বা ফান্ড না থাকায় হাসপাতালগুলোতে দিনে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।

অপারেশন থিয়েটারে জটিল অস্ত্রোপচার চলাকালীন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে লাইফ সাপোর্ট বা ভেন্টিলেটর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা রোগীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ এবং নবজাতকদের বিশেষ যত্ন ইউনিটে (NICU) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীরা প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনগুলো অচল হয়ে পড়ে থাকায় রোগ নির্ণয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

চিকিৎসাসেবার এই স্থবিরতা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এক মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গণঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নজনগণের এই চরম দুরাবস্থার মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

“গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে”—এই স্লোগানে জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে। জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ও মিছিলের গতি রোধ করতে সরকার দৃশ্যত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

যদিও সরকারি নেতারা এর মধ্যে হুমকি ধামকি দিচ্ছেন । কিন্তু বিএনপি সরকারও জানে যে এসব বিষয়ে খুব বেশি ধমক ও নীপিড়ন চালালে পাবলিক খেপে যাবে। তাই অনেকটা চুপ রয়েছে- বাগাড়ম্বর ছাড়া।

রাজপথের বড় রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে না পারলেও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা জনসমক্ষে সরকারের সমালোচনা করা সাধারণ নাগরিকদের ওপর নেমে আসছে প্রশাসনের নির্মম কুঠার।

সম্প্রতি তীব্র সংকটের মুখে ক্ষোভ প্রকাশকারী এক যুবককে গ্রেপ্তারের ঘটনা এটিই প্রমাণ করে যে, সরকার সংকটের সমাধান করার চেয়ে সংকট নিয়ে কথা বলা মুখগুলোকে বন্ধ করতেই বেশি আগ্রহী। এই ধরনের স্বৈরাচারী আচরণ এবং দমন-পীড়ন জনগণের ভেতরের ক্ষোভকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই চরম দুরাবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে রাজনৈতিক একগুঁয়েমি পরিহার করে বাস্তবমুখী ও কার্যকর যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে তা ভুলে গেছে তারেক রহমানের সরকার। তাদের দলের নেতাকর্মীরা এখন ধান্ধাবাজিতে ব্যস্ত।

আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনের আধুনিক ব্যবস্থা নিতে পারলে তবুও নাহয় সংকটের কিছুটা সমাধান হতো।

কিন্তু তার আগে দ্রুত ডলারের সংস্থান করে বিদ্যুৎ আমদানির বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা জরুরী। কিন্তু ডলারের প্রচন্ড সংকটে রয়েছে দেশ। ডলার সংগ্রহেগর পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে সফল কূটনৈতিক আলোচনা চালানো উচিত তা বুঝতে পারছে, কিন্তু রাজনীতিতো হচ্ছে “ভারত বিরোধীতা।”

একসময়ের লালবদর ও এনজিও কর্মী+সামাজিক সংগঠক দাবিদার ফেরদৌস আরো সমালোচনা করে বলেছেন, ‘ বিদ্যুতের দাম মাসে মাসে বাড়তেই থাকবে, গ্রাহকের ঘাড়ে চাপবে ভুতুড়ে বিলের বোঝা, নতুন করে বসানো প্রিপেইড মিটার বসানোর খরচও গুণতে হবে সাধারণ গ্রাহককেই।

বাসায় গ্যাসের সরবরাহ থাকবে না; মানুষ বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ পুড়িয়ে ভাত-তরকারি রান্না করবে, আর অতিরিক্ত ইউনিট ব্যবহারের জন্য আবার সেই গ্রাহককেই গুণতে হবে বাড়তি টাকা।

এত কিছুর পরও রাতে ঘুমাতে গেলে বিদ্যুৎ মিলবে না। পড়ার টেবিলে বসলেই বিদ্যুৎ হাওয়া হয়ে যাবে। লিফটে উঠলে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে মাঝরাস্তায় আটকে পড়ে থাকতে হবে। অন্যদিকে, অসৎ কর্মচারি ও কর্মকর্তারা চোরাই লাইনে বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দিয়ে নিয়মিত কমিশন পকেটে পুরবেন।

ওদিকে বড় বড় শিল্পপতি ও কোম্পানির কাছে জমে থাকবে কোটি কোটি টাকার বকেয়া বিল। বিদ্যুৎ অফিসের কর্তাব্যক্তিরা তাদের কাছে গিয়ে জ্বি হুজুর করে বলে আসবেন চিন্তার কোনো কারণ নেই সব ‘সিস্টেম’ হয়ে যাবে।

এখন প্রশ্ন হলো, যেসব সাধারণ গ্রাহক এক টাকাও হারাম উপার্জন করেন না, কষ্টার্জিত আয় থেকে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন, তাদের কোনো অপরাধ আছে কী?

পরীক্ষার ঠিক আগে পড়ার টেবিলে বসার পর যখন বিদ্যুৎ চলে যায় এবং দিনের পর দিন এভাবে বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়, তখন ক্ষোভের মুখে পড়ে কৈফিয়ত চাওয়া বা তীব্র ভাষায় গালি দেওয়া কি কোনো ‘ফৌজদারি অপরাধ’?

গালি দেওয়া কি কোনোভাবেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হতে পারে? নাকি এর মধ্যে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উপাদান লুকিয়ে আছে? বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সিফাত কিংবা রিফাত কারো কি মন খুলে রাগ ঝাড়ার বা গালি দেওয়ার অধিকার নেই?

আবার কবে থেকে গালিগালাজ করাটা ‘সন্ত্রাস দমন আইন’-এর সমার্থক হয়ে উঠল? নাকি গালি দেওয়ার কারণে সন্ত্রাসীরা দলবেঁধে গিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে কোনো হামলা চালিয়েছে? কই এমন খবর তো শুনিনি এখনো।’

যদি কোনো ক্ষুব্ধ নাগরিক দিনের পর দিন বিদ্যুতের কষ্টে ভুগে সরকারপ্রধানকে গালি দিয়ে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেই ফেলে, তবে সেই ক্ষোভ উপশম করা ও সমস্যা সমাধান করার দায়িত্ব সরকারপ্রধান এবং প্রশাসনের ওপরই বর্তায়।

পুলিশ পাঠিয়ে হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে জেলে পুরলেই সিফাতদের রাগ ও ক্ষোভ কমে যায় না! পুলিশী রাষ্ট্র কেবল জোর করে খাঁচাবন্দী করে ফেললো?

সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত আবদুল্লাহ সোশাল মিডিয়ায় ১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ভিডিওতে ক্ষোভ প্রকাশ ও গালিগালাজ করার অপরাধে তাকে পুলিশ আটক করে এবং পরবর্তীতে কোনো সরাসরি অভিযোগ ছাড়া তাকে ‘সন্ত্রাস দমন আইন’ এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
কিন্তু সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- প্রতিটি নাগরিকের চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত।

আইনি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিক ক্ষোভ বা গালিগালাজকে সন্ত্রাস দমন আইনের মতো কঠোর ধারায় ফেলার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

বিএনপি সরকার যদি নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে দমন পীড়নের আশ্রয় নেয় তাহলে কিন্তু পুঞ্জীভূত জনরোষ ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব দেশকে এমন এক অতল গহ্বরে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের গদি ঠিক রাখাও কষ্টকর হয়ে পড়বে।

#রাকীব হুসেইন : লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *