হিন্দুদের দুর্গাপুজা শুরু হচ্ছে এরই মধ্যে। তা বেশ ভালো কথা। কিন্তু এই পূজার জন্য এত পুলিশ, বিজিবিসহ আরো নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন কেন? তার মানে কি? আগাম হামলার সম্ভাবনা- আশংকা রয়েছে, তাই তো? নাহলে এত সাজসাজ রব কেন বাপু?

আর এসব কথিত নিরাপত্তার মধ্য দিয়েই এ দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের দুর্গাপূজা পালন করবেন? এতে করে কোন মান সম্মানের ব্যাঘাত ঘটবেনা আপনাদের হে সনাতনী সমাজ?

আচ্ছা, মুসলিমদের দুইটি ঈদ, ঈদে মিলাদুন্নবীসহ আরো বেশ কয়েকটি ধর্মীয় উৎসবতো পালিত হয় বা আমরা পালন করি। কই সেখানেতো এমন কঠোর নিরাপত্তা দেখিনা। এই পার্থক্য নিয়ে কি কেউ কখনো ভেবেছেন বা বলেছেন কিছু? কোন প্রশ্ন তুলেছেন এ নিয়ে? নাকি এসবকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছেন আমাদের সনাতনী ভাই- বোনেরা?

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংবিধানের মৌলিক অঙ্গীকার।

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির দাবিদার হলেও, প্রতি বছর ধর্মীয় উৎসবগুলোর সময় সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরে এক গভীর বৈপরীত্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহা যখন ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ততা ও সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে উদযাপিত হয়, ঠিক তখনই দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে মোতায়েন করতে হয় হাজার হাজার পুলিশ, বিজিবি এবং বিশেষ বাহিনী।

উৎসব উদযাপনে এই যে কাঠামোগত ও পরিবেশগত বৈপরীত্য, তা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নির্দেশক নয়, বরং এটি দেশের বহুত্ববাদী ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক স্লোগান এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বের এক গভীর সংকটের দিক উন্মোচন করে। এর ফলে উৎসবের নিরাপত্তা বনাম উৎসবের আনন্দ- বৈপরীত্যের স্বরূপ ফুটে উঠে উৎকটভাবে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন উৎসবগুলোর সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ মোতায়েন করা হলেও, সেখানে ইসলাম ধর্মীয় অনুষঙ্গ বা মসজিদ আক্রান্ত হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক ভয় থাকে না।শুধু তাই নয়, এটি কল্পনারও অতীত।

মুসলিম জনগোষ্ঠী এক ধরনের সহজাত সামাজিক ও সামষ্টিক সুরক্ষায় নিজেদের উৎসব উদযাপন করে। পক্ষান্তরে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার সময় চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। মণ্ডপে মণ্ডপে সিসিটিভি স্থাপন, চব্বিশ ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবক দলের পাহারা, এবং র‍্যাব-বিজিবি-পুলিশের সার্বক্ষণিক টহল—এই দৃশ্যপটটি একটি উৎসবের চিরাচরিত ও স্বস্তিদায়ক রূপকে কিছুটা হলেও আড়াল করে দেয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর এই উপস্থিতি একদিকে যেমন ভক্তদের আশ্বস্ত করে, অন্যদিকে তা এই নির্মম সত্যটি মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রীয় কড়া নজরদারি ছাড়া একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর উৎসবের অধিকার সুরক্ষিত নয়।

কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও বিভিন্ন সময় প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার যেসব বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটে, তা দেশের অসাম্প্রদায়িক মেলবন্ধনের দাবিকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

২০২৬ সালের দুর্গাপূজার পরিসংখ্যান ও সরকারি নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে একটু দেখে নেই। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপ ও মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এজন্য বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন হচ্ছে প্রচুর। তবে তা অতীতের মতই লোকদেখানো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘোষণা অনুযায়ী, পূজা নির্বিঘ্ন করতে সারা দেশে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানিয়েছে, ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের সীমান্ত এলাকা এবং ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের কাছাকাছি থাকা ২,৭২৭টি মণ্ডপসহ সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন থাকবে।

অন্যদিকে, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জানিয়েছেন যে, পুলিশের পক্ষ থেকে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিয়মিত পুলিশ, র‍্যাব ও আনসার সদস্যের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সোয়াত (SWAT), ক্রাইম রেসপন্স টিম (CRT) এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পূজা উদযাপন পরিষদ ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অবস্থান কি সেটা একটু দেখি। এ দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে উৎসবের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তারা প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবক দল মোতায়েনের মাধ্যমে নিজস্ব নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।

নেতৃবৃন্দের মতে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের গুজব বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি।

দেশের রাজনৈতিক স্লোগান এবং বাস্তবতার ব্যবধান:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রেইনবো সোসাইটি’ বা বহুত্ববাদী সমাজের ধারণা একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে বারবার সামনে এসেছে। এই মুখরোচক শব্দটি অবশ্য আমাদের জাতীয়তাবাদী দলের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। বিএনপিই এই টার্মটি এবার খুব বেশি ব্যবহার করছে।

তবে বিএনপি ছাড়াও ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময় দেশের সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করে একটি বৈচিত্র্যময় রংধনু সদৃশ সমাজ গঠনের কথা বলে আসছে।

তবে সমকালীন সামাজিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর এই আদর্শিক স্লোগান বা তাত্ত্বিক রূপরেখা মাঠপর্যায়ের চরমপন্থা, অসহিষ্ণুতা এবং সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে সক্ষম হয়নি।

ক্ষমতার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক মেরুকরণ যাই হোক না কেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় এবং ঘরবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান আজও অধরা।

রাজনৈতিক দলগুলো যখন মুখে সম্প্রীতির কথা বলে কিন্তু বাস্তবে স্থানীয় স্তরে ধর্মীয় উগ্রবাদ বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর জমি দখল ও আধিপত্য বিস্তার রোধ করতে পারে না, তখন ‘রেইনবো সোসাইটি’র মতো মহৎ রাজনৈতিক দর্শনগুলো কেবলই কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

সামাজিক মনস্তত্ত্বের কোন উন্নতিতো হয়নি বরং উগ্রবাদের প্রভাব আরো বাড়ছে প্রতিনিয়ত। একটি দেশের নাগরিকরা কেন নিজের দেশেরই অন্য নাগরিকদের উৎসবকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না, তার পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও উসকানিমূলক প্রচার এবং ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার বহুলাংশে দায়ী।

উৎসবের সময় এক পক্ষ যখন ধর্মীয় আচার পালনে ব্যস্ত, অন্য পক্ষের কিছু অংশ তখন মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বজায় রাখে অথবা একে এক ধরনের বিজাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে দেখার চেষ্টা করে।

এই মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনই উগ্রপন্থী ও দুষ্কৃতকারীদের মণ্ডপ বা উপাসনালয়ে হামলা চালাতে প্ররোচিত করে। আইনের শাসনের অভাব এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

একই রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মের উৎসব পালনের এই দৃশ্যমান বৈপরীত্য দূর করতে হলে কেবল উৎসবকালীন নিরাপত্তা জোরদার করাই যথেষ্ট নয়। এটি সাময়িক উপশম মাত্র, স্থায়ী নিরাময় নয়।

১. প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক সংস্কার: ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা তাদের উপাসনালয়ে যেকোনো ধরনের হামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দুষ্কৃতকারীদের বারবার উৎসাহিত করে।

২. সাংস্কৃতিক বিনিময় ও শিক্ষা: পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে সামাজিক স্তরে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে উগ্রবাদের ভয়াবহতা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।

৩. রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার: রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল নির্বাচনী স্লোগান হিসেবে ‘রেইনবো সোসাইটি’র ব্যবহার বন্ধ করে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের নেতাকর্মীদের সম্প্রীতি রক্ষায় জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ তখনই প্রকৃত অর্থে একটি সফল ও বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, যখন এ দেশের প্রতিটি নাগরিক—সে যে ধর্মেরই হোক না কেন—কোনো রাষ্ট্রীয় অস্ত্র বা বাহিনীর পাহারা ছাড়াই সম্পূর্ণ ভয়হীন ও আনন্দঘন পরিবেশে নিজের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারবে।

উৎসবের আনন্দকে খাঁচাবদ্ধ নিরাপত্তা থেকে মুক্ত করে সর্বজনীন ও সহজাত করে তোলাই হোক বাংলাদেশের আগামী দিনের মূল লক্ষ্য। তবে এটি নিশ্চিত যে– সে আশা সুদূর পরাহত। কারণ সাম্প্রদায়িকতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে লালন- পালন ও পরিচর্যা করে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উৎসবকে নির্বিঘ্ন- আনন্দমুখর- স্বতঃস্ফূর্ত করা সম্ভব নয়।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো স্বাভাবিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করে শুধু পূজোর সময় পূজামণ্ডপ পাহারা  দেয়ার জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে দেশের হিন্দুদের মন্ডপ পাহারা দিতে নিয়ে আসাতো একধরনের মশকরা ও অপমান করা।

তো সেই বিষয়টি আমাদের দেশের সনাতনী বা হিন্দু সমাজ কখন বুঝবেন?

# ইশরাত জাহান: লেখক, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *