চব্বিশের ৫ আগষ্ট ইসলামী জঙ্গী-সামরিক ক্যু এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকারকে উৎখাত করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ বিমানে ও বিশেষ নিরাপত্তায় পাঠিয়ে দেয়া হলো ভারতে।
কাউকে যদি জোর করে কোথাও পাঠিয়ে দেয়া হয় তাহলে যাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো তাঁকে কি আমরা পালানো হিসেবে আখ্যায়িত করি? নিশ্চয়ই তা করিনা। আর সেটি যদি না করে থাকি তাহলে সেই ৫ আগষ্ট থেকে বার বার সেই জঙ্গী-সেনা ক্যু এর পক্ষের লোকজনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে শেখ হাসিনা ‘পালিয়ে গেছেন’।
সেই গোয়েবলসীয় কায়দায় বার বার বলতে বলতে এটিকে পালানো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমেও তেমনটাই বলা হচ্ছে। কিন্তু তারা একটি বারও ভাবলেন না এটি সঠিক কি বেঠিক !

বাংলাদেশের সংসদীয় পদ্ধতির রীতিনীতি অনুযায়ী (বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী) রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পদত্যাগ ছাড়া তার মেয়াদতো শেষ হয়নি। এমনকি সংসদ নেতা হিসেবে তিনিতো সংসদও ভেঙ্গে দিতে বলেননি। তার মানে কি দাঁড়ায় ?
বাংলাদেশের সংবিধানই যদি মানেন তাহলেতো শেখ হাসিনাই এখনো প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু বন্দুকের নলের মুখে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিন দিয়ে কিছু গেজেট প্রকাশ করানো হলো।
যে আদেশ জারি করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল সেসব গেজেট ও আদেশও কিন্তু অবৈধ। রাষ্ট্রপতির মুখ দিয়ে একবার বলানো হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতিও কোন পদত্যাগপত্র দেখাতে পারেননি।
শুধু রাষ্ট্রপতি কেন উড়ে এসে জুড়ে বসা ড.ইউনুসওতো সেই পদত্যাগের কোন টিকিটিও উদ্ধার করতে পারলেন না।
এমনকি এই জঙ্গী-সেনা ক্যু এর অন্যতম হোতা বিশ্বাসঘাতক সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও পারলেন না কোন পদত্যাগ দেখাতে। কিন্তু বললেন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে চলে গেছেন।
আরে জনাব জঙ্গী সেনাপ্রধান ওয়াকার সাহেব, আপনাদের সশস্ত্র বাহিনীর বিমানে করেইতো আপনারা জোর করে পাঠালেন প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে। তো সেটি পালানো হয় কি করে? আর জামায়াত-বিএনপি ও টোকাই জঙ্গী সংগঠন এনসিপিও একই সুরে গাইছে এক কথা।
তো নিজেরাই পোঠিয়ে দিলেন ভারতে। আর তারপর বলছেন তিনি পালিয়েছেন?! রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর মাধ্যমে একের পর এক আদেশ জারি করে গেজেট প্রকাশ করতে থাকলেন।
আপনারা বললেন ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য আপনারা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপীল বিভাগের মতামত নিয়ে এসব করেছেন। তো তখনতো সব বিচারক পলাতক অথবা সেনাবাহিনীর কব্জায়।
কখন-কোথায় বসলেন তারা এই মতামত দিতে? মহামান্য আদালতের সেই মতামত চাওয়া হলেও অদ্যাবধি আদালতের সেই মতামত কেউ দেখাতে পারেননি। আসলে এটিও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের মতই। তাহলে এটি আদালতের মতামত বোধ হয় গায়েবি । যেমন গায়েবি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র।
তো শেখ হাসিনা ভারতে বসেইতো বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমগুলোকে বলছেন যে তিনি দেশে আসতে চান। তার ভাষায় তিনি প্রত্যাবর্তন করতে চান। কিন্তু আগের ইউনুসীয় সরকার ও এখনকার তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষ ভারত সরকারের কাছে বলা হয়েছে শেখ হাসিনাকে তারা প্রত্যর্পণ চান।
ক্ষমতাচ্যুতি, দেশত্যাগে বাধ্য করা , সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা এবং পরবর্তীতে ‘ক্যাঙ্গারু ট্রাইবুন্যাল’ এর মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগ সংক্রান্ত প্রচণ্ড ধোঁয়াশা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি সূক্ষ্ম কিন্তু জটিল ও সংবেদনশীল অবস্থঅর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই সংকট কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক মানদণ্ডের মৌলিক প্রশ্নসমূহ।
প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যর্পণ নিয়ে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের পরিভাষায় ‘প্রত্যাবর্তন’ (Repatriation) এবং ‘প্রত্যর্পন ’ (Extradition) সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ধারণা, যাদের উদ্দেশ্য ও প্রয়োগপদ্ধতি সমান্তরাল নয়।
প্রত্যাবর্তন (Repatriation) মূলত একটি মানবিক ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক প্রক্রিয়া। কোনো ব্যক্তি যখন যুদ্ধ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, বা কোনো জরুরি সংকটের কারণে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় কিংবা নিজস্ব উদ্যোগে স্বদেশে ফিরে আসেন, তখন তাকে প্রত্যাবর্তন বলা হয়।
এটি ব্যক্তির নিজ রাষ্ট্রে ফেরার আইনগত অধিকারের সাথে সম্পর্কিত এবং এতে কোনো শাস্তিমূলক বা বিচারিক বাধ্যবাধকতা সাধারণত থাকে না।এখানেতো শেখ হাসিনাকে জোর করে বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো হয়েছে।
অপরদিকে প্রত্যর্পণ (Extradition) একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, বাধ্যতামূলক এবং বিচারিক দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া।
যখন কোনো ব্যক্তি এক দেশে গুরুতর অপরাধ (যেমন হত্যা, দুর্নীতি বা মানবতাবিরোধী অপরাধ) করার পর বা বিচারের মুখোমুখি থাকা অবস্থায় অন্য দেশে পালিয়ে যান, তখন অপরাধ সংঘটিত হওয়া রাষ্ট্রটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করতে বা সাজা কার্যকর করতে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চায়।
এটি দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ (Extradition Treaty) এবং অভ্যন্তরীণ আইনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।তো শেখ হাসিনা কিভাবে ‘প্রত্যর্পণ’ আইনের আওতায় পড়বেন ?
সেনাবাহিনী বা সশস্ত্রবাহিনী কিন্তু অদ্যাবধি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাদের বিমানে করে অন্যদেশে পাঠিয়ে দেয়ার বিষয়ে কোন কিছু বলেনি অফিসিয়ালি। কিছু বলতে গেলে হয়তো আইনীভাবে ফেঁসে যাবে যুক্তির জায়গায়। ফলে তারা নানাভাবে এটিকে এড়িয়ে যাচ্ছেন সযতনে।
তবে আমার কাছে মনে হয় শেখ হাসিনাকে দেত্যাগে বাধ্য করার বিষয়টিকে তারা তাদের সামরিক পরিভাষায় একটি ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ বা সংকটকালীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখাতে চায়। কিন্তু সেটিওতো স্পষ্ট করতে হবে। তাওতো বলেনি তারা।
সমালোচক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থকদের মতে, শেখ হাসিনা কোনো চোরাপথে বা অবৈধভাবে দেশত্যাগ করেননি। সশস্ত্রবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমান বিশেষ নিরাপত্তা ও সহায়তায় তাঁকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ আশ্রয়ে (ভারতে) পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী যখন কোনো বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে এসকর্ট করে অন্য দেশে নিয়ে যায়, তখন সেটিকে এক অর্থে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বা “সেফ প্যাসেজ” (Safe Passage) হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে “পালিয়ে যাওয়া” বলঅ চলেনা কোনভাবেই। নিদেনপক্ষে পরিস্থিতির চাপে “রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় স্থানান্তর” বলা যুক্তিসঙ্গত বলে পার পাওয়ার একটি চেষ্টা করতে পারে মাত্র।
তাছাড়া ভারতের সব রাজনৈতিক দল একমত হয়ে বলেছে যে, শেখ হাসিনা তাদের বিশেষ সম্মানিত অতিথি। তাহরে তারা সেই অতিথির সম্মান বজায় রাখার চেষ্টা করবে নিশ্চয়ই। সেক্ষেত্রে এখনকার সরকার ও সশস্র বাহিনী কি পারবে যেভাবে শেখ হাসিনাকে ভারতে নিয়ে রেখে এসেছিল সেভাবে সম্মানের সঙ্গে ফেরত আনতে ?
শেখ হাসিনাকে যখন দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় তখন পর্যন্ত দেশের কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেনি।
তিনি আইনগতভাবে দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবেই দায়িত্বে ছিলেন । ফলে, একজন ক্ষমতাসীন বা সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে চরম সংকট মুহূর্তে নিরাপত্তা প্রটোকল দিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া চেইন অব কমান্ডের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তো এখন যখন আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন যে তিনি দেশে ফিরবেন এবং ডিসেম্বরেই ফিরবেন, এই ঘোষনাতেতো মাথা খারাপ হয়ে গেছে বাংলাদেশের এখনকার বিএনপি সরকার ও জামায়াতসহ জঙ্গী টোকাই এনসিপিসহ অন্যদের।
তারা নানাভাবে আবোল-তাবোল বলা শুরু করেছে। কেউ বলছে তাকে আসতে দেয়া হবেনা। আবার কেউ বলছে তাকে আসা মাত্রই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
ইতিমধ্যেই একটি ‘ক্যাঙ্গারু ট্রাইবুন্যাল’ থেকে শেখ হাসিনিাকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তার বক্তব্য উপস্থাপনের, আইনজীবী নিয়োগের এবং উপযুক্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে যদি কোনো আদালত তড়িঘড়ি করে সাজা ঘোষণা করে, তবে আন্তর্জাতিক আইনি পরিভাষায় তাকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বা প্রহসনের বিচার বলা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং উন্মুক্ত আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার এবং আইনি আশ্রয় লাভের মৌলিক অধিকার রয়েছে।
এছাড়া, জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এর ১৪ অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে যে, আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার (Trial in Absentia) করা গেলেও তাকে সমন পাঠানো, আইনজীবী নিয়োগ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক সর্বোচ্চ সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তারতো কিছুই হয়নি।
এই ক্যাঙ্গারু কোর্টে শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রধান যুক্তিসমূহ যদি তুলনা করি আমরা তাহলে কি দেখতে পাই ? ট্রাইবুন্যাল ও সরকার পক্ষের যুক্তি হলো- ১৯৭৩ সালের আইনে যেকোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের স্পষ্ট এক্তিয়ার রয়েছে।
অপরদিকে সমালোচক ও আন্তর্জাতিক মহলের অভিযোগ- আইনটি মূলত একাত্তরের প্রেক্ষাপটে তৈরি, বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে এর ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধ।
আসামীর অধিকার সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে-প্রচলিত আইন অনুযায়ী সব সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার কোন নমুনা দেখতে পাইনি।
আইনজীবীদের নিরাপত্তা হীনতা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব স্পষ্ট। সরকারের দাবি- ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান’র পর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়াস এই ট্রাইবুন্যাল। অপরদিকে সমালোচক ও আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ হলো- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে নির্মূল বা সাজা দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে যা খুশি তাই করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বারবার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু এখনো ভারত তার কোন জবাব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি ২০১৬ সালের সংশোধিত চুক্তির বিষয়গুলোকে তুলে ধরে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইছে।
কিন্তু যেখানে আদালতে শেখ হাসিনার পক্ষে তার নিজের কোন আইনজীবীকে নিযুক্ত করতে দয়ো হয়নি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
এই ‘প্রত্যর্পণ’ চুক্তিতে একটি ধারা রয়েছে যে, ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ অপরাধের জন্য কাউকে প্রত্যর্পণ করা যাবে না। ভারত যদি সেই যুক্তি তুলে ধরে তাহলেতো কিছুই করার নেই বাংলাদেশের। কারন আমরা দেখেছি ভারতে এ ধরনের কোন ‘ক্যাঙ্গারু ট্রাইবুন্যা ‘ নেই। তারা তাতে বিশ্বাসও করেনা।
বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কোনো কোনো মন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশে একাধিক হত্যা মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তাই তিনি দেশে পা রাখামাত্রই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।
আবার হঠাৎ করে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহিদ বা সরকারের অন্যান্য সূত্র থেকে এমন ইঙ্গিতও এসেছে যে, আইন নিজের গতিতে চলবে এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বার্থেই তাঁর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বন্দি অবস্থায় বা বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক নিরাপত্তা বিধান করা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের অংশ।
কিন্তু অপরদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা এবং চরমপন্থী দলগুলোর (যেমন এনসিপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক মঞ্চ) একাংশের দাবি আরও কঠোর। তাদের দাবি, ছাত্র-জনতার ওপর দমনপীড়নের দায়ে তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি (ফাঁসি) হওয়া উচিত এবং এ ক্ষেত্রে কোনো রকম আপস করা চলবে না।
এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রমাণ করে যে, বিষয়টি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ রয়েছে।
শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন এবং তাঁর বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়টি কেবল একটি আইনি বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি লিটমাস টেস্ট।
একটি দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। অপরদিকে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের পক্ষ থেকেও তাদের নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করার পক্ষে সঠিক বক্তব্য উপস্থাপন করাটিও জরুরী।
কিন্তু এখনকার যে ট্রা্ইবুন্যাল সেটির গঠন প্রক্রিয়া, বিচারক ও প্রসিকিউটরদের নিয়ে প্রবল আপত্তি রয়েছে আওয়ামীলগের পক্ষ থেকে। তারা কোনভাবেই এই ক্যাঙ্গারু কোর্ট মানতে রাজী নয়। সেজন্য তারা তাদের যুক্তিও দেখাচ্ছেন।
তো অনেকে বলছেন, সবচেয়ে ভালো হয়-বাংলাদেশের সশস্র বহিনীকে দায়িত্ব দেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা। তারা ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট যেভাবে শেখ হাসিনাকে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছিনে সেভাবেই পারলে ফেরত আনুক। এরপর আদালত-আইন অনুযায়ী যা বিচার করার কথা সেভাবেই হোক।
অবশ্য এটি একটি কথার কথা। কারণ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষে তা কোনভাবেই সম্ভব নয়।
আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বহুমুখী সংকট কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইন এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির এক অগ্নিপরীক্ষাও বটে।
বর্তমান বাস্তবতায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। রাজনৈতিক আবেগের বশে কোনো একতরফা রায় দিলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো সমালোচনার সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে যদি এটি হ্যান্ডেল করতে না পারে তাহলে ভারতের সঙ্গে বরং বৈরিতাই বাড়বে।
তাই সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের। তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কোন নিক্তিতে মাপতে চাইছেন তার ওপর নির্ভর করছে। অপরদিকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর না করলে তারেক জিয়া ভারতে যাবেন না বলে যে বালখিল্য গোঁ ধরেছেন তা নিশ্চয়ই খুব বেশিদিন তিনি আর রাখতে পারবেন বলে মনে হয়না। পরিবেশ–পরিস্থিতি তেমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
# ইশরাত জাহান: লেখক, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার কর্মী।
