বাংলাদেশ-ভারতের বিভিন্ন সীমান্তে গত কয়েকদিন ধরেই নানা বয়সী মানুষকে নিয়ে ধরেই পুশইন-পুশব্যাক চলছে।আমি একটু অন্যভাবে যদি বলি- আসলে “পুশইন-পুশব্যাক খেলা” চলছে দুই দেশের মধ্যে।
আমার এ মন্তব্যে হয়তো অনেকেই প্রচণ্ড ক্ষেপে যাবেন। আমাকে অমানবিক বলবেন।হৃদয়হীন বলবেন। আরো অনেকভাবে গালিগালাজ করতে পারেন।সেটাই স্বাভাবিক। কারণ সাদাচোখে বা সাদামাটাভাবে আমাদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক।
কিন্তু আমরা সমস্যার প্রকৃত বিষয়টি জানতে চাইছিনা বা জেনেই এটি নিয়ে ঘৃণ্য রাজনীতি করছি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে যেসব সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ সীমান্তে যেসব নাগরিককে জড়ো করেছে বিএসএফ মানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনী তারা কিন্তু নিজেদেরকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবেই পরিচয় দিচ্ছেন।
তাদের বাড়ি বাংলাদেশের কোথায়, কবে নাগাদ তারা ভারতে গিয়েছেন, চোরাই মানে অবৈধ পথে গিয়েছেন, কোন দালালের মাধ্যমে গিয়েছেন তাও বলছেন।
এদের মধ্যে কেউ ৫ বছর আগে গিয়েছেন, কেউ ১০ বছর আবার অনেকে ২৫ থেকে ৩০ বছর আগেও গিয়েছেন। শুধু গিয়েছেন নয়, অনেকে সেখানকার পরিচয়পত্রসহ নানা ধরনের নাগরিক সুবিধা নেয়ার জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন তাও বানিয়ে নিয়েছেন।
অনেকে সেখানকার ভোটারও হয়েছেন, ভোট দিয়েছেন। তবে এবার যে পশ্চিমবঙ্গে ভোট হয়েছে সেই ভোটে অংশ নিতে পারেনি।কারণ এবারের বিধানসভা ইলেকশনের আগে সেখানকার সরকার-নির্বাচন কমিশন পুংখানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করেছে।
ফলে অনেক মানুষ যে সেখানকার মানে ভারতের নাগরিক নয় তার প্রমাণ পেয়েছে।জিজ্ঞাসাবাদে এসব মানুষগুলো অকপটে স্বীকার করেছেন যে তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গিয়ে সেখানে অবৈধভাবে বসবাস, বেসরকারি চাকরি, ছোটখাটো ব্যবসা, হকারি, কারো বাসা-বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে বা দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছেন।
এর সমস্ত কিছুইতো তাদের বয়ানে উঠে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এরা এতদিন কি করে ছিল বা কি করে বার বার সীমান্ত দিয়ে আসা যাওয়া করেছে?
বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশ-ভারতের যে সীমান্ত রয়েছে তার অনেক জায়গাতেই কাঁটাতারের বেড়া নেই। বাংলাদেশের ডান-ইসলামপন্থী ও ভারতবিরোধী পত্রিকা হিসেবে পরিচিত দৈনিক ইনকিলাব।
এই পত্রিকাটিরই তথ্য অনুযায়ী যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা গেছে- বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬ দশমিক ৭০ কিলোমিটার।
এর মধ্যে বিভিন্ন নদী, জলাশয় এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে প্রায় ৮৫৬ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার এলাকায় কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। ইনকিলাবসহ আরো কিছু সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী বাংলাদেশ-ভারতের মোট সীমান্ত দৈর্ঘ্য হলো- ৪,০৯৬.৭০ কিলোমিটার।
যার মধ্যে ভারতের ৫টি রাজ্য—পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া সম্পন্ন এলাকা হলো- ৩,২৩৯ দশমিক ৯২ কিলোমিটার, যা মোট সীমান্তের প্রায় ৭৯ দশমিক ০৮ শতাংশ। অপরদিকে বেড়াবিহীন এলাকার পরিমাণ হলো- ৮৫৬ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার, যা মোট সীমান্তের প্রায় ২০ দশমিক ৯২ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সীমান্ত পিলার থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না। তাই মূলত নদী, জলাভূমি, দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং এই নির্দিষ্ট (১৫০ গজের) নিয়মটির কারণে অনেক এলাকায় এখনও কাঁটাতার দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এছাড়া মেঘালয়ের এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে স্থানীয় সমস্যা ও ভূখণ্ডের কারণে কিছু অংশে বেড়ার কাজ বাকি রয়েছে। এসব এলাকায় উভয় দেশের মানবপাচারকারি-সীমান্তরক্ষীদের যোগসাজশে পরাপার হচ্ছে মানুষ- এটিতো অস্বীকার করার উপায় নেই।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছুদিন থেকেই বলা হচ্ছিল- বঅরতের পশ্চিমবঙ্গসহ তাদের বিভিন্ন রাজ্যে অসংখ্য বাংলাদেশী রয়েছেন।
যারা অবৈধভাবে মানে কোন ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই ভারতে প্রবেশ করে রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই নিয়মানুযায়ী তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারি।
বাংলাদেশেও যদি এমন কোন ভারতীয় নাগরিক থেকে থাকে মানে ভিসা-পাসপোর্ট বিহীন তাদেরকেও আমরা নিশ্চয়ই অবৈধ অনুপ্রবেশকারি বলবো।নাকি আমাদের ‘মেহমান’হিসেবে আখ্যায়িত করবো?
সেটি নিশ্চয়ই করবোনা।যদিও আমরা অোমাদের দক্ষিন পূবের দেশ মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম নাগরিকদেরকে আমাদের মেহমান হিসেবে আপ্যায়িত করে যাচ্ছি বছরের পর বছর ধরে।
এই রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে বলতে গেলে অনেক বিষয় এসে যাবে, তাই আর সেদিকে যাচ্ছিনা।
আপাতত আমরা ভারত-বাংলাদেশ বিষয়েই থাকি পুশইন-পুশব্যাক নিয়ে।বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারি ও দেশ ধ্বংসকারি নো-বেল লরিয়েট ড. ইউনুস সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল( যদিও এটি তার প্রকৃত নাম নয়)দাবি করেছিলেন-বাংলাদেশে ২৬ হাজার ভারতীয় নাগরিক বাস করে।
যদিও এর কোন তথ্য প্রমাণ তিনি জাতির কাছে হাজির করেননি। কেন করেননি তা আমরা জানিনা। এই যে ২৬ হাজার ভারতীয় বাংলাদেশে রয়েছে তাদেরকে অতিদ্রুত চিহ্নিত করে ভারতের কাছে একযোগে পাঠিয়ে দেয়াটা আমাদের দেশের জন্য নিশ্চয় অত্যন্ত ফরজ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু সেই কাজটি আমরা কেন করছিনা ?
বাধা কোথায়? সেই আসিফ নজরুল স্যারের কাছ থেকে(অনেকে তাকে ষাড় বলে থাকেন)কেন তথ্য চাওয়া হচ্ছেনা? ইউনুস সরকারের প্রায় দেড় বছর গেল, এখনকার বিএনপি সরকারেরও প্রায় তিন মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেল।
এসব অবৈধ ভারতীয় নাগরিকদের ব্যাপারে কেন বাংলাদেশ সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছেনা?ভারত যেহেতু তাদের দেশ থেকে অবৈধভাবে বসবাসকারি বাংলাদেশী নাগরিকদেরকে ঠেলে বের করে দিচ্ছে বা পুশব্যাক করাচ্ছে সেক্ষেত্রে আমাদেরওতো উচিত শক্ত অবস্থান নেয়া এই ২৬ হাজার অবৈধ ভারতীয়দের ব্যাপারে। নাকি ডাল মে কুছ কালা হ্যায় ?
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত বিধানসভা ইলেকশনের আগ থেকেই ভারত সেদেশে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশী নাগরিকদের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
ইলেকশনের পরে সে প্রক্রিয়া তারা আরো জোরেশোরে শুরু করেছে।তবে বেশ ভালো লাগছে যে- আমাদের দেশের সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই সেই পুশইন ঠেকিয়ে দিচ্ছে।
শুধু তাই নয়, সীমান্তে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকরাও প্রচন্ড সাহসিকতার সঙ্গে ভারতীয়দের এই ‘পুশইন’ প্রক্রিয়াকে ঠেকিয়ে দিকে প্রচন্ড জোশের সাথে এগিয়ে এসেছেন।– এসব দেখে নিজেদের বোকামির জন্য হাসি পায়।

আমাদেরতো দেশেতো বটেই এমনকি ভারতের অনেকেই এই ‘পুশইন-পুশব্যাক’কে অমানবিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ডায়মন্ড হারবার ওমেনস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক অনিন্দিতা ঘোষাল তার ফেসবুক পেইজে প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন- ‘আমরা অনেকেই বর্ডার, বর্ডারল্যান্ড, নো-ম্যানস-ল্যান্ড সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা করি।
কিন্ত গবেষণা আর বাস্তবতার মধ্যে ঠিক কতটা ফারাক, ঠান্ডা ঘরে বসে আলোচনা যে, এই প্রান্তিক মানুষগুলোর মাথার ওপর ছাদ না থাকা, রোজ রোদ-বৃষ্টি-ঝড় পেরিয়ে বেঁচে থাকার একাংশেরও পরিপূরক নয়, সেই অসহায়তা আবার টের পেলাম।
দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক তরজার পরে, এই তথাকথিত নো-ম্যানস-ল্যান্ডে আটকে পড়া পরিবারগুলোর কপালে কোন দেশ জুটবে, কে জানে। কিন্ত, এই মানসিক ট্রমা যে এই ক্লাস সিক্সে পড়া মেয়েটার মনে এবং মাথায় সারাজীবন থাকবে, তার মাসুল কে গুণবে?’
এক্ষেত্রে এই ইতিহাস গবেষক শিক্ষিকা এক অসহায় বালিকার ছবিও সংযুক্ত করেছেন।স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে এ নিয়ে রেখাপাত করবে। এ ছাড়াও নানা ছবি প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
তবে বাংলাদেশের মেইনস্ট্রীম সংবাদ মাধ্যমে সত্যিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কি প্রকাশ পাচ্ছে “পুশইন-পুশব্যাক’ নিয়ে? কেন প্রকাশ পাচ্ছেনা – প্রশ্নটি সেখানেই। সরকার বলছেন বা দাবি করছেন- সংবাদমাধ্যম স্বাধীন। তাহলে সত্য প্রকাশ করতে অসুবিধে কোথায়?
নাকি ভেতরে ভেতরে সবাই সরকার অখুশী হয় সেজন্য কিছু করছে না, নাকি নিজেরাই সেল্ফ সেনসর করছে?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলায় গত ৯ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কিছু অংশ তুলে ধরতে চাই পাঠকদের অবগতির জন্য। তাদের সেই প্রতিবেদনে বলঅ হয়েছে- “বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে অনেক সময় উত্তেজনা বা প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত বিপুল সংখ্যায় মানুষকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা আগে দেখা যায়নি।
মূলত, ২০২৫ সালে ভারত থেকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাভাষী ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষদের বলপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে- ওই বছরের সাতই মে সর্বপ্রথম এরকম ঘটনা শুরু হয়, যা চলে প্রায় অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু সম্প্রতি ফের শুরু হয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ওই সময়ের দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছিলো। এরপর তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে যে অধিকাংশই বাংলাদেশি। তবে তাদের মাঝে অন্তত ১২৬ জন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন।
এর আগে সীমান্তে মারামারি, গোলাগুলি, চোরাচালান – হলেও খুব একটা এরকম ‘পুশইনের’ ঘটনা ঘটেনি, এটা আমাদের জন্য “নতুন ধরনের আলামত” – বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশের একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।
বিশেষ করে, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।
তখন দুই পক্ষেই ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং দুই দেশের রাজনীতিবিদরা একে অপরকে আক্রমণ করে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলেছে।
এ বিষয়ে এমদাদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের দিক থেকেও কিছু আনওয়ান্টেড কথা বলা হয়েছে। যেমন, সেভেন সিস্টার্সের বিষয়ে আমাদের দায়িত্বশীল এবং দায়িত্বের বাইরের মানুষও বিভিন্ন মন্তব্য করেছে। এগুলোর ফলশ্রুতি এই পুশইন।”
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও সেটি মূলত অপরাধী বা রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কিন্তু অবৈধ অভিবাসীদেরকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) বা নির্দিষ্ট কাঠামো নেই।
ভারত জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, বাংলাদেশ আবার তাতে স্বাক্ষর করেছে। তাই, বাংলাদেশ সেই কনভেনশনের নীতিমালা অনুসরণ করে।
ফলে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন বিবেচনায় নিতে হয়েছে।
কিন্তু ভারতের কাছে অভিবাসন ও শরণার্থী-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সাধারণত ‘কেস-টু-কেস’ বিবেচনা করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এ কারণে আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসীদেরকে চিহ্নিত করে ফেরত দেওয়া, এটা ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে গড়ে ওঠেনি।”
ভারত থেকে যাদেরকে সীমান্ত দিয়ে পাঠানো হচ্ছে তাদের দেখলে বা কথা শুনলে স্পষ্টই বুঝা যায় এরা বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশেরই একদল মানুষ ভারতে চলে গিয়েছিল, বেআইনিভাবেই গিয়েছিল, ওরা দেশে ফিরতে চাইছে। কিন্তু আমাদের বিজিবি ওদেরকে দিকে বন্দুক তাক করে রেখেছে, ওদেরকে ঢুকতে দিচ্ছে না, এটা কিরকম কথা?
আমেরিকা থেকে যখন আমাদের একদল নাগরিককে ধরে বেঁধে প্লেনে করে দেশে পাঠিয়ে দেয়,তখন কি ওদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে আবার ফেরত আমেরিকা পাঠিয়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার না তা করার সাহস আছে? অথবা মালয়েশিয়া থেকে যখন পাঠায়? অথবা মায়ানমার থেকে যখন রোহিঙ্গারা এসে ভিড় করে আমাদের সীমান্তে?
এই রোহিঙ্গারাতো আমাদের নাগরিকই না।তাহলে তাদেরকে ঢুকতে দেবেন, আপ্যায়ন করবেন জামাই আদরে। আর আমাদের দেশের নাগরিকদেরকে ঢুকতে দেবেন না, বন্দুক তাক করে রাখবেন- এটা কেমন কথা হলো? কেমন আইন হবে? এ কেমন মানবাধিকার? এ কেমন শান্তির ধর্ম ইসলাম?
অনেকেই বলছেন- একটা আইনি প্রক্রিয়ায় ভারত ওদেরকে ফেরত পাঠাতে পারতো।কিন্তু আইনইতো নেই এ ব্যাপারে। সেক্ষেত্রে একমাত্র উপায় বাংলাদেশ এসব নাগরিকদের নিজের দেশের হিসেবে স্বীকার করে দেশে নিয়ে আসতে পারে।
সেটা তো ভারতের সাথে আলাপ আলোচনা করে এমনিই ঠিক করে নেওয়া যায়। এই অসহায় লোকগুলিকে কেন হেনস্থা করবো আমরা?
অথচ আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়-বিজিবি ওদের দেশে ফেরার চেষ্টা ‘ঠেকিয়ে দিয়েছে’। এটা শুনতে কিরকম লাগে? একদল গরীব-অসহায় মানুষ দুই মুঠ ভাত জোটানোর চেষ্টায় বা কোন দুষ্ট লোকের পাল্লায় পড়ে বা যে কোন কারণেই হোক দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
এখন ফিরতে চাইছে- বা ধরেন সেই দেশের সরকার চাপ দিচ্ছে ওদেরকে ফিরে আসবার জন্যে বা জোর করে ধরেই না হয় ফেরত পাঠাচ্ছে- ওদেরকে আসতে দিবেন না?

সরকারকে বলি, দয়া করে বিষয়টা দেখেন, দেশের মানুষ যদি দেশে ফিরতে চায়, বাধা দিবেন না। একটা কোন বীরত্ব নয়, এটা অন্যায়। এই দেশের নাগরিক যদি না হয় তাইলে আলাদা কথা।
গত এপ্রিল মাসের হিসাব দেখেন ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে! জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার হিসাব মতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬৯ জন রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে এদের ঢুকতে কোন বাধা দেয়া হয় না।
কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিক যারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে জীবিকার জন্য বসবাস করছিল তাদের ভারত সরকার ধরে ধরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠালে কেন বাংলাদেশের সরকার গ্রহণ করবে না?
এর দুটি কারণ। রোহিঙ্গারা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ইসলামি শাসনের জন্য ম্যান পাওয়ার। এরা ভবিষ্যতে এরকম কোন উত্থানে কাজে দিবে। অথবা ভোটার হয়ে ভোটব্যাংক হবে।
আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রোহিঙ্গা অনুমোদন ছিল খাল কেটে কুমির আনা। রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠি অশিক্ষিত ও কট্টর ইসলামী মৌলবাদ তাদের মধ্যে বদ্ধমূল।
রোহিঙ্গা নারীরা অধিক সন্তান জন্ম দেয় কারণ জন্মনিয়ন্ত্রণ করা ইসলামে হারাম। এই রকম জনগোষ্ঠী এখন বাংলাদেশে কত কোটি হয়ে গেছে এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য ধর্মান্ধ মৌলবাদী ম্যানপাওয়ার ছাড়া আর কিছুই না।
ভারত থেকে সেদেশে অবৈধভাবে যাওয়া বাংলাদেশীদেরকে নিজ দেশে প্রবেশ করতে বাধা দেয়াটি কি অমানবিক নয়?
বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বলুক এরা বাংলাদেশের নাগরিক নয়। সেটি তো তারা করছে না। কারণ তারা জানে এরা বাংলাদেশের নাগরিক। তাহলে এমন করছে কেন? এটা হচ্ছে ভারতের সঙ্গে একটা ইগো বা অহংবোধ দেখানো ইচ্ছে করে।
কারণ দেশের বিদ্যুতহীনতা, গ্যাসের সমস্যা, সরকারের একশো দিনে নাকি ছয়শোর বেশি খুন হয়েছে- এসব থেকে দৃষ্টি সরাতে দুটি জিনিস খেলে দিতে হবে- ইসলামপ্রেম ও ভারত বিরোধীতা।
সীমান্তে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি যদি বিএসএফের সঙ্গে বেশ গরম গরম কথা বলে দম্ভ দেখায় তার ভিডিও প্রচার করে বাহবা কুড়ানো হচ্ছে মাত্র।
আর এসব দেখিয়ে দেশের মধ্যেকার অসংখ্য সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি ও আলোচনাকে অন্য দিকে সরিয়ে রাখার একটি অপকৌশল মাত্র।এই ঘৃণ্য রাজনীতির কোরবানী হচ্ছে দেশে ফিরতে চাওয়া বাংলাদেশীরা।
#ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।
