বাংলাদেশে ইসলাম রক্ষার নামে পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কিছু ইসলামী রাষ্ট্রের সহায়তায় ইসলামী জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয় সেই নব্বই দশক থেকে।
বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্র-শিক্ষকদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ উনিশশো আশির দশকের শেষ দিকে আফগানিস্তানে যায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মুজাহিদীনদের পক্ষে লড়াই করতে।
দেশে ফিরে তারাই গঠন করে হরকাত-উল জিহাদ বা হুজি-বি। পরে নানা নামে হয় আরো বেশ কিছু জঙ্গি সংগঠন।
গোপন তৎপরতার পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের হয়েও কাজ করতে থাকে এসব জঙ্গি সংগঠনের নেতারা। এসব জঙ্গীসংগঠনে মধ্যে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মুসলিম ক্যাডাররাও রয়েছে।
আর সারাদেশে এই যে ইসলামী জঙ্গী ক্যাডারদের নানা সন্ত্রাসী হামলা, বোমা প্রশিক্ষণ, অস্ত্র চালোনো, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, গ্রেনেড বানানো এসবের পেছনে রয়েছে জঙ্গী শিরোমণি জামায়াতে ইসলামী।

আর জামায়াতের সঙ্গে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম জঙ্গীদের রয়েছে অনেক আগে থেকেই এক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। জামায়াতে ইসলামী এই রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে “ব্রাদার ইন ইসলাম” বলে সম্বোধন করে তাদেরকে একটি স্বাধীন ইসলামী রোহিঙ্গা রাষ্ট্র বা “স্বাধীন ইসলামী আরাকানী রাষ্ট্র” গড়ে দেয়ার খোয়াব দেখিয়ে নানা অপকর্ম করিয়ে নিচ্ছে।
অথচ রোহিঙ্গা মুসলিমদের সেই স্বাধীন রোহিঙ্গা ইসলামী রাষ্ট্র “খোয়াব” ই থেকে গেছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতে ইসলামীর এই যে ইসলামের নামে সাধারণ মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করা সে বিষয়ে নানা নিবন্ধ, নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।
বিগত অবৈধ-অগণতান্ত্রিক সামরিক-জঙ্গী সমর্থিত ড.ইউনুস সরকারের সময়তো এসব রোহিঙ্গা জঙ্গীরা বরং আরো সবচেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা পেয়েছে। সেই সুযোগ-সুবিধে শুধু আর্থিক নয়। সে সুযোগ-সুবিধা একেবারে সরাসরি সামরিক সহযোগিতা ছিল।

সেনাবাহিনী, বিজিবি, বিভিন্ন সামরিক গোয়েন্দা প্রশিক্ষক এমনকি পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর অত্যন্ত দক্ষ সামরিক প্রশিক্ষকগণও এই রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে নানাভাবে অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়েই সাহায্য করেনি, তাদেরকে কোন দেশের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি ও গেরিলা যুদ্ধ কেমনে করতে হয় সে ট্রেনিংও দিয়েছেন।
সেই সাথে তাদেরকে প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়েও সহায়তা করা হয়েছে।
আর এই ট্রেনিংয়ের অধিকাংশই হয়েছে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকার পাহাড়ি অঞ্চলে। এমনকি কক্সবাজার থেকে শুরু করে উখিয়া টেকনাফসহ ওই এলাকার বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকত ও সৈকত সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাতে।
এই জঙ্গী সামরিক প্রশিক্ষণ এখনও অব্যাহত রয়েছে, তবে তা একটু রেখে ঢেকে হচ্ছে , এই যা।
বিভিন্ন সামরিক গোয়েন্দা ও বৃহত্তর কক্সবাজার এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ইউনুস সরকারের সময় জামায়াতে ইসলামী অবাধে ও অত্যন্ত দাপটের সাথে প্রশাসনের বিভিন্ন পদে কাজ করেছে এসব অঞ্চলে।
কক্সবাজারের রামুতেও রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বড় ও শক্তিশালী আধুনিক সেনানিবাস। এই সেনানিবাসের পক্ষ থেকেও নানা ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করা হয়েছে ইসলামী জঙ্গীদেরকে।
পাঠকদের হয়তো মনে থাকার কথা যে, ইউনুসের অপশাসনের সময় থেকে পাকিস্তান ও তুরস্ক থেকে পাক সেনা ও তুরষ্কের সেনাবাহিনী ও তাদের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিশাল বহর নানা সময়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মহেশখালী, টেকনাফ এমনকি সেন্টমার্টিন্স দ্বীপও পরিদর্শন করেছেন।
এই পরিদর্শন যে কখনোই প্রমোদ ভ্রমণ ছিলনা তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এসব ইসলামী দেশের সামরিক অফিসাররা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরসহ নানা এলাকা ঘুরে দেখেছেন। এই পরিদর্শন শুধু মানবিক সাহায্য সহযোগিতা দেয়ার জন্য নয়, যদিও প্রচার করা হতো যে এটি শুধুই মানবিক সহায়তা প্রদানের সফর।
কিন্তু এই মানবিক সহায়তা প্রদান সামগ্রীর অন্তরালে অন্য কিছু কাজ করেছে।
বাংলাদেশে নামে-বেনামে জামায়াতের বিভিন্ন জঙ্গী শাখা এবং ভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক নামেও জঙ্গী সংগঠন রয়েছে যাদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় একটি ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করার জন্য।
এই জামায়াত-তাদের অশ্য প্রশিক্ষণ, রোহিঙ্গা ইসলামী সংগঠন ও রোহিঙ্গা ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে জামায়াতের যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে তা নিয়েও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে।
এসবের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে সাংবাদিকেরা নানাভাবে হেনস্থারও শিকার হয়েছেন।
নব্বইয়ের দশকের আগে থেকে জামায়াতে ইসলামী এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ অবধি জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের জঙ্গিবাদী সংশ্লিষ্টতা নিয়ে লিখতে লিখতে এদেশের অনেক সাংবাদিক ও লেখক শুধু ক্লান্তই হয়ে পড়েননি। এদের মধ্যে কেউ কেউ সরকারের রোষানলে পড়ে কারাভোগও করেছেন।
যখনই জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের অভিযোগ উঠেছে, যখনই গ্রেনেড বা বোমা হামলা হয়েছে, যখনই বিরোধী রাজনীতিবিদ বা বুদ্ধিজীবীদের ওপর হামলা হয়েছে—জামায়াতের একসময়কার আমির মতিউর রহমান নিজামী ও তার সহযোগীরা সবসময় এর দায় চাপিয়েছেন আওয়ামী লীগের ওপর বা ভারতের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।
তারা বাংলাভাইয়ের মতো ভয়ংকর জঙ্গিদের অস্তিত্বই অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন এগুলো মিডিয়ার তৈরি গল্প।

অথচ গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব জঙ্গিরা জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। এ কারণেই নিজামীরা জঙ্গিদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে নিজেদের দায় এড়াতে চেয়েছিলেন।
তবে ২০০৬ সালের পরে মানে সামরিক নিয়ন্ত্রিত ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতারের পর সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর স্বীকার করেছিলেন , কীভাবে জোট সরকার জঙ্গিবাদের উত্থানে সহায়তা করেছে ।
এমনকি তিনি এমনও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিজে জামায়াতে ইসলামীর জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করেছেন। তবে নানা প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক উথাল-পাথালের পর সেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিপত্তিশালী লুৎফুজ্জামান বাবর এখন আবার কারাগারের বাইরে।
এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও বিদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নানা লেখায় বের হয়েছিল যে, সেসময়ে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে (আইবিবিএল)-এর সঙ্গে জঙ্গিদের আর্থিক লেনদেনের বেশ কিছু তথ্য প্রামাণ্য তুলে ধরা হয়েছিল।
সেসব লেখায় দেখা গেছে, ঢাকায় অবস্থানরত হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম (হুজি) মিয়ানমারের নেতারা কীভাবে আইবিবিএলে হিসাব পরিচালনা করতেন।
অবশ্য আইবিবিএল সে লেখার প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল—সেসব লেখায় ব্যাংকটির সঙ্গে জঙ্গিবাদের সম্পর্ক জোর করে তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তারা দাবি করে যে উল্লিখিত কোনো সংগঠনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
তারা আরও জানায়, আব্দুল কুদ্দুস নামে এক ব্যক্তি নিয়ম মেনে হিসাব খুলেছিলেন, যা ২০০৫ সাল থেকে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। এর জবাবে বক্তব্য খুবই সরল—পৃথিবীর কোথাও জঙ্গিরা নিজেদের সংগঠনের নামে ব্যাংক হিসাব খোলে না; তারা সাধারণ মানুষের নাম ব্যবহার করে।
পাঠকদের এটিও হয়তো স্মরণে থাকবে যে বাংলাদেশে হুজির প্রথম মুখপত্র ছিল মাসিক ‘জাগো মুজাহিদ’, যার লক্ষ্য ছিল যুবকদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিভিন্ন দেশের বৈধ সরকার উৎখাতের আহ্বান জানানো।
এই পত্রিকার সব আর্থিক লেনদেনই আইবিবিএলের মাধ্যমে হতো। শুধু তাই নয়, এই হিসাব ব্যবহার করে তারা অন্যান্য জঙ্গি কার্যক্রমও পরিচালনা করত।
রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) নামে একটি জঙ্গি সংগঠন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে সক্রিয়। তারা বহু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দিয়ে পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও লিবিয়ায় জিহাদি প্রশিক্ষণের জন্য পাঠিয়েছে।
তাদের আন্তর্জাতিক মুখপত্র ‘আল তাদামুন’-এ প্রকাশিত এক ঘোষণায় ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে জিহাদের জন্য অর্থ পাঠানোর আহ্বান জানানো হয় এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিবরণও দেওয়া ছিল।
এছাড়া আরএসও-র উর্দু মুখপত্র ‘ইনসাফ’-এও আইবিবিএল ও দুবাই ইসলামিক ব্যাংকে তাদের হিসাব থাকার কথা উল্লেখ আছে। এত কিছুর পরও কি আইবিবিএল বলবে তারা এসব জঙ্গি সংগঠন সম্পর্কে জানে না, বা তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই?
আইবিবিএল দাবি করেছে যে তাদের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বহুবার প্রকাশিত হয়েছে যে তাদের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
আমরা যদি একটু পেছনের দিকে যাই তাহলে দেখবো–২০০৪ সালে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে আইবিবিএলসহ জামায়াতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যায়।
সফর শেষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়, আইবিবিএল জামায়াতে ইসলামীর পরিচালনায় চলছে এবং এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক। এর সফলতা ইসলামী আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
আইবিবিএলের তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহ আবদুল হান্নানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতেই পারে—এতে আপত্তি নেই। কিন্তু আপত্তি অন্য জায়গায়। তাহলো ইসলামী জঙ্গিবাদের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে।
বিগত ড.ইউনুস সরকারের রোষানলে পড়ে গ্রেপ্তার ও কারান্তরীণ দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ-গবেষক অধ্যাপক আবুল বারকাত তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে জামায়াত ক্ষমতায় থেকে সংখ্যালঘুদের প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ একর সম্পত্তি দখল করেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২০ বিলিয়ন টাকারও বেশি।
সঠিক তদন্ত হলে শুধু বিড়াল নয়, বাঘ-সিংহও বেরিয়ে আসবে। তবে এখনকার তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যদি সত্যিই সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্তরিক হয়, তবে এসব বিষয় দ্রুত তদন্ত করা উচিত।
তবে সে আশা সুদূর পরাহত। জামায়াতের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গী সংগঠনগুলোর যে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রয়েছে তার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে—শুধু সংবাদপত্র বা গবেষণায় নয়, গোয়েন্দা সংস্থার নথিতেও। ভবিষ্যতে আরো কিছু লেখা হাজির করার আশা রাখি এ বিষয়ে।
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
