পর্ব-১

সীমান্তে অযথা হত্যাকাণ্ড–গুলি-অপহরণ-নির্যাতন নিশ্চয়ই কারো কাম্য নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশি দেশ ভারত ও মিয়ানমারের দীর্ঘ স্থল ও নদীপথে সীমান্ত রয়েছে।

আর এই সীমান্তে নানা সময়েই ইসলামী জঙ্গী, সন্ত্রাসী, অস্ত্র-মাদক চোরাকারবারি, গরু চোরাককারবারী, মানব পাচারকারিসহ নানা ধরনের অপরাধীদের বেহেস্ত হয়ে আছে। এ বিষয়টি নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না।

তবে প্রতিটি দেশই চায় তার নিজস্ব দেশ বা সীমান্ত রক্ষিত ও নিরাপদে থাকুক। এজন্য কেউ কেউ তার দেশে কাঁটাতারের বেড়া বা এমনকি সীমান্ত প্রাচীরও দিতে পারে আন্তর্জাতিক আইন মেনে। তাতে কারোই দ্বিমত পোষণ করার কথা নয়।

স্বাভাবিকভাবেই আপনার বাড়ি, ঘর বা জমির নিরাপত্তা বিধান করার জন্য আপনি নিশ্চয়ই সচেষ্ট থাকবেন। আপনি নিশ্চয়ই সেখানে বেড়া-দেয়াল বা ফেন্সিং দেবেন আপনার সক্ষমতা অনুযায়ী।

তাতে প্রতিবেশির বিরোধিতা করার কোন সুযোগ নেই- যদি আপনি তা স্বাভাবিক নিয়মের কোন ব্যত্যয় না ঘটান। আর কোন চোর-ডাকাত বা দুষ্কৃতিকারি যদি আপনার ঘরে চুরি-ডাকাতি বা সম্পদ লুট করে নিতে চায় আপনি কি তা সহজে নিতে দেবেন? নাকি প্রতিরোধ করবেন?

আর সেই প্রতিরোধ করতে গিয়ে বা আপনার সম্পদহানি- প্রাণহানির আশংকা দেখা দিলে নিশ্চয়ই আপনি আপনার সম্পদ ও জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় যা কিছু দিয়েই হোক প্রতিরোধ করবেন।

তাতে যদি ডাকাত-দুষ্কৃতিকারি বা চোরের প্রাণহানি বা জখমের ঘটনা ঘটে সে দায়ভার নিশ্চয়ই আপনার ওপর বর্তাবে না। কারণ আপনি নিজের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য করেছেন।

কিন্তু আমাদের দেশে বা অন্য দেশেও কিছু লোক আছেন যারা সীমান্তে কিছু একটা ঘটলেই প্রলয়ংকরি কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে সবসময় প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু কেন, কি কারণ বা কোন পরিস্থিতিতে গুলি বা প্রতিরোধের ঘটনা ঘটেছে তা আর সঠিকভাবে খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করবেন না এই শ্রেণীর লোকজন।

আবার তাদের কিছু এনজিও রয়েছে যারা মানবাধিকার ব্যবসা করে থাকেন বিদেশী টাকায়।

ঘটনাকে নানাভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রসাত্মক করে বাজারে প্রচার করাই যেনো এদের মূল কাজ। কারণ যত বেশি রং লাগাতে পারবে তারা এসব ঘটনার ততই তাদের প্রতি সহানুভুতি মানে ডলারের যোগান বাড়বে বিদেশ থেকে।

তবে এসব কথিত মানবাধিকার ব্যবসায়র সঙ্গে যুক্ত এনজিওগুলিকে যার যার দেশেরও কিছু স্বার্থান্বেষী মহল যারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায় তারাও নানাভাবে সাহায্য ও সহায়তা করে থাকে।

তা ভারতে হোক বা বাংলাদেশেই হোক, এমন বিষয় প্রযোজ্য। কারণ নানা সময়ে আমি বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন মানবাধিকার, সীমান্ত সংক্রান্ত বিরোধ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের সংবাদ বিশ্লেষণ ও ওইসব এনজিওর কর্মকাণ্ড দেখেছি।

এরা এই সীমান্ত ইস্যুকে এনজিওগুলো এমনভাবে রংচং লাগায় যে তাতে যে কারো মনে রেখাপাত করতে বাধ্য। আর যত বেশি রং লাগাতে পারবে এরা ততই তাদের ফান্ড স্ফীত হবে।

সত্যিকার মানবাধিকার রক্ষায় নেই এদের। এদের মূল কাজ হলো টাকার ধান্ধা করা। এই সীমান্ত সমস্যা যদি বন্ধ হয়ে যায় তাদের এনজিও দোকানও বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা নানা ইস্যুতে এই সীমান্ত সমস্যাকে নানাভাবে জিইয়ে রাখতে চায়। নানা ইস্যু বের করে।

কারণ তা না হলে তো তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। আর ব্যবসা বন্ধ হলেতো ভাত বন্ধ তাদের। তো স্বাভাবিকভাবেই কারো ভাত বন্ধ হয়ে যাওয়াটাওতো অমানবিক, তাই না ? কি বলেন আপনারা!!

এই যে মানবাধিকারের রমরমা ব্যবসা চলে কিভাবে তা কি ভেবে দেখেছেন কেউ কখনো?

বাংলাদেশে রয়েছে আদিলুর রহমান শুভ্র নামে এক লোকের ‘অধিকার’ নামে একটি মানবাধিকারের দোকান। তিনি আবার বিএনপি-জামায়াত পুষ্ট মার্কিন ও পশ্চিমা বিশ্বের ডিপষ্টেটের খাস মানুষ। যিনি বিগত ইউনুস সরকারের অন্যতম শক্তিশালী উপদেষ্টাও ছিলেন।

তার এই অধিকার নামক মানবাধিকারের দোকান থেকে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় নানা ধরনের সত্যমিথ্যা ও অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে বেশ ভালোই ব্যবসা করেছে।

মার্কিন ডিষ্টেটের অত্যন্ত কাছের ও প্রচন্ড বেনিফিসিয়ারি এই আদিলুর রহমানের অতীত ও এখনকার কর্মকান্ড খোঁজ-খবর নিলেই জানতে পারবেন তার এই সাদাশুভ্র চুলের মধ্যে যে কি পরিমাণ শয়তানি ও বাংলাদেশ বিরোধীতা লুকিয়ে আছে।

অপরদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও রয়েছে ‘মাসুম’ নামে একটি মানবাধিকার এনজিও বা মানবাধিকার দোকান। সেটির যিনি অধিকর্তা রয়েছেন তার সঙ্গে একবার কলকাতাতে দেখা হয়েছিল একটি মানবাধিকার সম্মেলনে।

তখনই তার সাথে বাংলাদেশের হিন্দু অত্যাচার-নির্যাতন নিয়ে কথা বলে দেখেছি তিনি এই বিষয়টিকে যতটা না মানবাধিকার নির্যাতন-নিপীড়ন হিসেবে বিবেচনা করছেন তার চেয়ে বেশি করছেন রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে। তার চেয়ে তিনি বরং পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের নিয়ে বেশি চন্তিত দেখেছি।

সম্ভবত ২০০৪ বা ২০০৫ সালে যখন বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে ইসলামী জঙ্গীদের রমরমা অবস্থা বিরাজ করছে, ভারতের সেভেন সিস্টার্সে উলফাসহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠনের অপরাধ বেড়ে চলেছে ক্রমাগত তখন তার কাছে এগুলো তাদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন হিসেবেই পরিগণিত হয়েছে।

এখন ঠিক মনে করতে পারছিনা মাসুম নামের সেই এনজিওটির অধিকারিকের (ভারতীয় বাংলায় বললাম) নামটি।

আসলে তখন অতটা বুঝতে না পারলেও আঁচ করতে কষ্ট হয়নি যে এই ‘মাসুম’ ও ‘অধিকার’ এর মধ্যেকার আন্তঃসংযোগ কোথায়। তাদের মধ্যে অনেক তথ্য আদান-প্রদান হয়।

তাদের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন।পরে সেটির অনেক যোগসূত্র পেয়েছি। এরা মূলত দুই দেশের ইসলামী মৌলবাদী-জঙ্গীদের প্রচ্ছন্নভাবে সহায়তা করে থাকে।

মানবাধিকারের কথা বলে সীমান্তে মাদক-অস্ত্র-নারী-বিষ্ফোরক চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদেরকেও “নিরীহ গ্রামবাসী” বলে চালিয়ে দেয়ার জন্য তাদের প্রানান্তকর চেষ্টা থাকে। সেই কাজটিই তারা করে যাচ্ছেন অনেক বছর ধরে। আর তাদের মাসিক-ত্রৈমাসিক-ষান্মাসিক ও বাৎসরিক রঙচঙা প্রতিবেদন দিয়ে তারা সংবাদমাধ্যমে তাদের প্রচারনা চালিয়ে থাকেন।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে ও নিজেদের দেশের যে সব ডোনার রয়েছে তাদের কাছে না পাঠিয়ে নিজেদের ডলারের পরিমাণটি আরো বাড়িয়ে নেয়।

আর এস প্রতিবেদনকে নানাভাবে বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাকেও ‘খাওয়ানোর’ চেষ্টা করে থাকেন তারা।

বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের তুলনামূলক চিত্র যদি একটু বিশ্লেষণ করি তাহলে ঠিকই স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রকৃত চিত্র। মজার বিষয় হলো- বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানি বা বিরোধ নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন কথিত মানবাধিকার সংগঠন বা অন্যরা প্রচন্ড রকমের সোচ্চার।

তারা শুধু সোচ্চারই নন। পারলে কিছু কিছু রাজনৈতিক ও ইসলামী জঙ্গী ছাত্র-যুব সংগঠনতো এখুনি ভারতের মসনদ দখল করে এই সীমান্ত হত্যার জবাব দেয় আর কি!!

আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তনীদের একটি সংগঠন রয়েছে ‘ রাওয়া’ নামে। যার নেতৃত্বে রয়েছে মেজর-ক্যাপ্টেন-কর্নেল গোছের কিছু সাবেক কর্তাব্যক্তি। এরা মূলত ইসলামী জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত।

Oplus_131072

আর এদেরকে প্রেট্রোনাইজ করে জামায়াতে ইসলামী, হিযবুত তাহরীরসহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন। অবশ্য দীর্ঘ কয়েকবছর ধরেই বাংলাদেশের ‘ডিজিএফআই ‘ নামক রাষ্ট্রের ভেতর রাস্ট্র নামক সামরিক সংস্থাটি এই রাওয়াকে নানাভাবে প্রোমোট করে আসছে।

গত চব্বিশের জুলাই-আগষ্টে “ইসলামী জঙ্গী –সামরিক ক্যু “ এর আগে পড়ে আমরা তাদের আস্ফালন দেখেছি। তখনতো তারা ঢাকায় প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে হাস্যকরভাবে বলেছে- “বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দরকার নেই, এই রাওয়ার সদস্যরাই যদি একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে কলকাতা দখল করতে তাদের চারদিনের বেশি লাগবেনা, ইত্যাদি ইত্যাদি।”

এভাবে উষ্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেকার যে স্বাভাবিক সৌহার্দ্যমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক সেটিকে নষ্ট করেছে। দুই দেশের জনগন ও সরকারের মধ্যে যে হৃদ্যতা ছিল তা বিণষ্ট করতে এসব কিছু পাকিপন্থী জঙ্গী লোকই যথেষ্ট।

তখন অবশ্য মেটিকুলাস ডিজাইনার ড. ইউনুস ও তার বশংবদ উপদেষ্টা ও কয়েকটি টোকাই রাজনৈতিক দলও ছিল তাতে বাতাস দেয়ার জন্য।

এসব তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার যে কথিত মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে তাদের নানামুখী কর্মকান্ড সঠিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ ও লাগাম টেনে ধরা অত্যন্ত জরুরী। কারণ তা না হলে এরাই এই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বন্ধুত্বপূর্ণ বা প্রতিবেশিসুলভ সম্পর্ককে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।

# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *