বাঙালি সংস্কৃতির মূল শক্তি ছিল তার বহুত্ববাদ, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সমন্বয়বাদী চেতনা। হাজার বছরের বিবর্তনে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় স্তম্ভগুলোর অন্যতম হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন সাঁই, জীবনানন্দ, নজরুল বঙ্কিমের মতো সারস্বত সাধকেরা।

তবে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে বারবার এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর আঘাত এসেছে। পাকিস্তান আমলের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়কালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, উগ্রপন্থা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর পটপরিবর্তন—প্রতিটি অধ্যায়েই বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান প্রতীকগুলোকে নিশানা করা হয়েছে।

বাঙ্গালির মূল অর্জনগুলো ধ্বংসের সমস্ত নীলনকশা করা হয়েছে। সংস্কৃতির এই সংকট, বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বান্দ্বিকতা এবং উগ্র ভাবাদর্শের উত্থানকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশদ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অতি সম্প্রতি এক অর্বাচীন তরুণী ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লাগিয়ে যে অশুভ বার্তা দিতে চেয়েছে তা কিন্তু কোন একদিনের চিন্তাপ্রসূত বিষয় নয়।এর পেছনে দীর্ঘদিনের ঘৃণ্য মনোবিকৃতিই কাজ করেছে।

কারণ এ দেশের পাকিপন্থী, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তি ও ইসলামী হিকুমত কায়েম বিপ্লবীরা সুযোগ পেলেই এমন অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে বার বার। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই এই অন্ধকারের অপশক্তি ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।

পাকিস্তান আমল ও রবীন্দ্র-বিরোধিতার রাজনীতি:

বাঙালি সংস্কৃতি ও রবীন্দ্র-বিরোধিতার মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে দ্বিজাতিতত্ত্ব নির্ভর (মুসলিম- হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে) পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মানসিকতার মধ্যে। বাঙ্গালীর কাছে স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্র রচনা, সাহিত্য, রবীন্দ্র সঙ্গীত তার সত্ত্বার সাথে মিশে আছে।

পাকি শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি সবসময়েই প্রচন্ড রকমের অস্বস্তিকর ছিল, এবং এখনো তাই। বাঙ্গালীর প্রাত্যহিক জীবনে এত রবীন্দ্র অনুরাগ, রবীন্দ্রপ্রেম কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি পাকি মুসলমানেরা। পাক শাসকগোষ্ঠীর কাছে রবিঠাকুর এক প্রচন্ড শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

বাঙ্গালী জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রে বিশ্বকবি রবিঠাকুরের এই যে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পাকি মুসলমানেরা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাইকে লক্ষ্য করে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, “আপনারা রবীন্দ্রসংগীত লিখতে পারেন না?” এই উক্তিটি কেবল একজন শাসকের অজ্ঞতা প্রকাশ করে না, বরং তৎকালীন রাষ্ট্রের বাঙালি সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করতে না পারার চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ ছিল।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-শতবর্ষ উদযাপনে বাধা দেওয়া এবং ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন কর্তৃক রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা ছিল সংস্কৃতির ওপর প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় আঘাত।

পাকিস্তানি শাসকেরা মনে করত, রবীন্দ্রচেতনা বাঙালির আত্মপরিচয়কে জাগ্রত করে, যা তাদের কৃত্রিম ইসলামীকরণ ও রাজনৈতিক শোষণের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। কিন্তু তৎকালীন বাঙালি বুদ্ধিজীবী, ছাত্রসমাজ ও সংস্কৃতিকর্মীরা এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।

এই স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সেইসব প্রতিষ্ঠান, যা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে।

এর অন্যতম প্রধান উদাহরণ হলো:

* ছায়ানটের রমনার বটমূলে বোমা হামলা (২০০১):

পহেলা বৈশাখের নতুন বছরের আবাহন অনুষ্ঠান চলাকালে এই নৃশংস হামলা চালানো হয়।

এটি ছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসবের ওপর সরাসরি আঘাত।

* উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সম্মেলনে হামলা (১৯৯৯):

যশোরে উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলা চালিয়ে বহু সংস্কৃতিকর্মীকে হত্যা ও আহত করা হয়।

এই হামলাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এগুলো ছিল বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান ধারাকে ভয় দেখিয়ে সমাজকে একটি অনুদার ও উগ্র কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়ার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।

৩. সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট: চব্বিশের পরবর্তী সাংস্কৃতিক রূপান্তর ও অস্থিরতা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ‘ ইসলামী- জঙ্গী- সেনা ক্যু’ এর পর বাংলাদেশের সামাজিক- রানৈতিক ক্ষেত্রে গভীর শূন্যতা ও অস্থিরতারও জন্ম দিয়েছে। এই ক্রান্তিকালে সমাজ ও সংস্কৃতির একাংশে চরম অসহিষ্ণুতার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা লালন শাহের মতো ব্যক্তিত্বদের ওপর নতুন করে মতাদর্শিক ও শারীরিক আঘাতের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়া কিংবা কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ির মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সমাজকে মৌলবাদী ও সংকীর্ণ চিন্তার দিকে ধাবিত করার একটি চেষ্টা সর্বদা সক্রিয় থাকে।

৪. ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগ্রহশালা এবং ঐতিহ্য ধ্বংসের রাজনীতি:

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়গুলোর একটি হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিবিজড়িত সংগ্রহশালায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কেবল একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন না, তিনি ছিলেন উপমহাদেশের সঙ্গীত সাধনা ও সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। তাঁর সংগ্রহশালা পুড়িয়ে দেওয়া কেবল কোনো ভবনে আগুন দেওয়া নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্যিক সুর, রাগ ও ইতিহাসের স্মারক মুছে দেওয়ার এক সচেতন প্রচেষ্টা। এই ধরনের সহিংসতা সংস্কৃতির ওপর উগ্র মতাদর্শের চরম অসহিষ্ণুতার প্রতীক।

৫. বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার

সাংস্কৃতিক সংকটের সমান্তরালে সমাজে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান তৈরি হচ্ছে, যেখানে বাঙালি সংস্কৃতির ধর্মনিরপেক্ষ উপাদানগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়।

এই ধারার বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকদের অনেকে, যাদের মধ্যে লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের মতো ব্যক্তিত্বদের নাম আলোচনায় আসে, তারা ঔপনিবেশিকতা এবং আধুনিকতার সমালোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় লোকসংস্কৃতি ও রবীন্দ্র-বঙ্কিম ধারার সাহিত্যকে পশ্চিমা বা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আধিপত্যবাদী বয়ান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সমাজকে মেরুকরণ করার এবং রবীন্দ্র-বিরোধী মনোভাব উস্কে দেওয়ার একটি শক্তিশালী সাইবার-প্রোপাগান্ডা সক্রিয় রয়েছে।

৬. প্রতীকের ওপর আঘাত: মুরালে কালিমা লেপন ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব

সম্প্রতি দেশের কোনো কোনো স্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাস্কর্য বা মুরালে কালিমা লেপন বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তরুণ বা যুবসমাজের সম্পৃক্ততা সামাজিক মনস্তত্ত্বের এক গভীর অন্ধকারের দিক নির্দেশ করে।

এই আচরণগুলোর পেছনে কাজ করে দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক ইসলামী কট্টরপন্থী দীক্ষা। যখন শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক পরিমণ্ডলে সংস্কৃতির উদার চর্চা সংকুচিত হয়ে পড়ে, তখন তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ খুব সহজেই চরমপন্থী ও উগ্র ভাবাদর্শের শিকার হয়। তারা শিল্প ও সংস্কৃতিকে ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতির প্রধান প্রতীকগুলোর ওপর আঘাত হিসেবে প্রকাশ পায়।

৭. সমালোচনা ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:

ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন বনাম বহুত্ববাদের নানা সংঘাত কিন্তু থেমে নেই। এই সমস্ত অপতৎপরতা এবং সাংস্কৃতিক আক্রমণের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কাজ করছে: তা হলো বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী সাংবিধানিক ও সামাজিক ভিত্তি ভেঙে একটি অনুদার ভাবাদর্শিক রাষ্ট্র বা তথাকথিত উগ্র ইসলামী ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করা।

তবে এই ধরণের উগ্র উত্থানকে পুরো মুসলিম সমাজের সাধারণ আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা ভুল হবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই ধার্মিক, কিন্তু তাদের অনেক চরমপন্থী বা উগ্রবাদী নয়।

বাঙালি মুসলিম সমাজ একই সাথে ইসলাম ধর্ম পালন করেছে এবং পহেলা বৈশাখ, নবান্ন ও রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীতকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছে। তাই মুষ্টিমেয় কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে সামগ্রিক সমাজের রূপান্তর ভাবা বাস্তবসম্মত নয়, তবে একে হালকাভাবে নেওয়ারও সুযোগ নেই।

পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই- আগষ্ট পরবর্তী সময় পর্যন্ত বাঙালি সংস্কৃতির ওপর যতবারই আঘাত এসেছে, ততবারই এ দেশের সাধারণ মানুষ ও সংস্কৃতিকর্মীরা তার প্রতিরোধ করেছেন। রবীন্দ্র-বিরোধিতা কিংবা লালন-ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার চেষ্টা আসলে বাঙালির নিজস্ব জাতিসত্তাকে অস্বীকার করার শামিল।

এই সাংস্কৃতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ হলো শিক্ষার প্রতিটি স্তরে মানবিক ও উদার সাংস্কৃতিক চর্চার প্রসার ঘটানো, অপপ্রচার ও ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্মারকের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সংস্কৃতির বহুত্ববাদকে রক্ষা করাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও মানবিক ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।

প্রসঙ্গক্রমে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ূন আজাদ তাঁর ‘জলপাই রঙের অন্ধকার’ প্রবন্ধে লিখেছেন –

‘… রবীন্দ্রনাথ, যাঁকে বাতিলের চেষ্টা করে আসছে নষ্টরা পবিত্র পাকিস্তানের কাল থেকে; পেরে ওঠেনি। এমনই প্রতিভা ওই কবির, তাঁকে বেতার থেকে বাদ দিলে তিনি জাতির হৃদয় জুড়ে বাজেন; তাঁকে পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দিলে তিনি জাতির হৃদয়ের কাব্যগ্রন্থে মুদ্রিত হয়ে যান; তাঁকে বঙ্গভবন থেকে বাদ দেওয়া হলে তিনি সমগ্র বঙ্গদেশ দখল করেন; তাঁর একটি সঙ্গীত নিষিদ্ধ হলে তিনি জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠেন।

প্রতিক্রিয়াশীল নষ্টরা অনেক লড়াই করেছে তাঁর সাথে, পেরে ওঠে নি; তাঁকে মাটি থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি আকাশ হয়ে ওঠেন; জীবন থেকে তাঁকে নির্বাসিত করা হলে তিনি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন জাতির স্বপ্নালোকে। নষ্টরা তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে আপ্রাণ। যদিও তিনি জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা, তবুও তিনি জাতীয় কবি নন; তাঁর নামে ঢাকায় একটি রাস্তাও নেই; সংস্থা তো নেইই। তাতে কিছু যায় আসেনি তাঁর; দশকে দশকে বহু একনায়ক মিশে যাবে মাটিতে। তিনি বেঁচে থাকবেন বাঙলায় ও বিশ্বে।’

যে সকল নির্বোধরা আজকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি লেপন করে সেই বিশেষ বিকৃত মানসিক বিকারগ্রস্তরা আসলে তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে যাদের পড়াশোনার দৌড় এইটুকুই।

এই মূর্খরা যখন বলে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়!!! ( ঢাকা‌ বিশ্ববিদ্যালয়) এর প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন অথচ তারা বলতে পারেনা এই তথ্যটি কোন সূত্র থেকে তারা পাঠ করছে বা জেনেছে। বলতে পারেনা কারণ তদের কাছে সঠিক কোন রেফারেন্স নেই।

কারণ তারা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে একটি মিথ্যা তথ্য উচ্চারণ করে নিজেদেরকে প্রচার মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক করে রাখতে চায়। এটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

যারা বেড়ে উঠেছে কুসংস্কারাচ্ছন্ন পারিবারিক বলয়ের ভেতর দিয়ে কুশিক্ষার মধ্য দিয়ে যারা ইতিহাস পড়েনি ঠিকঠাক যারা বাংলা সাহিত্য নিয়ে ন্যূনতম ধারণা রাখেনা যারা রবীন্দ্রনাথ নজরুল জীবনানন্দ লালন জসীমউদ্দিন শামসুর রাহমান পাঠ করেনি নিবিড়ভাবে কোনদিন নিজেদের পড়াশোনা যোগ্যতা নিয়ে যাদের কোন নিজস্ব মূল্যায়ন নেই তাদেরকে নিয়ে কেন এই সময় নষ্ট করা এটাও প্রশ্ন জাগে মনে বারবার ।

তবুও বলতে ইচ্ছে হয় এই অধমরা জানেনা ১৯৭১ এ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথ নজরুলের গান কবিতা ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রেরণা।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা হল গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার পেছনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পৃক্ততার কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই।

১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে কোনো এক সভায় রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন বলে যে মিথ্যা দাবি করা হয়, তথ্য অনুযায়ী সে সময় তিনি কলকাতায় ছিলেন না; বরং তিনি শিলাইদহে অবস্থান করছিলেন এবং সেখানে বসে কবিতা ও গান রচনা করছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা তো দূরে থাক, বরং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে এসেছিলেন।

এ সফরে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।

১৯৩৬ সালের ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্মানসূচক ডক্টরস অব লিটারেচার (D.Litt) ডিগ্রি প্রদান করা হয়। তৎকালীন উপাচার্য ছিলেন স্যার এ. এফ. রহমান।

রবীন্দ্রনাথ যদি কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্য বা পরোক্ষ কোনো বিরোধিতা করতেন, তবে প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৫ বছরের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করত না। সুতরাং, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন মর্মে যে কথাটি উত্থাপিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য।

মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে হানাদার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বহু চেষ্টা করেও রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গালীর হৃদয় থেকে মনন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। আজ সেখানে সেই পরাজিত রাজাকার আলবদরের বংশধর ঘৃণ্য পাকি সন্তানরা কোন ছার!

নাট্যকার দীপংকর দস্তিদারের ভাষায় –“কালি যারা মাখাল, গল্পটা কি শুধু তাদের নিয়েই?

রবীন্দ্রনাথ ভারতীয়, বিদ্যাসাগর ভারতীয় তাই তাঁদের বর্জন করতে হবে! এই ধরনের বক্তব্য কিছু স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী বলে আসছেন বটে ।তেমনি এ সময়ে এসে ঐ উস্কানিটা পুনরায় দিয়েছে অতি পরিচিত এক বুদ্ধিজীবি। কিন্তু সেই বক্তব্য শুনে কিছু অতি উৎসাহী তরুণ যদি রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি মাখায়, তখন প্রশ্ন ওঠে কালির পাত্রটা তাদের হাতে তুলে দিল কে?

এখন ফেসবুক থেকে সংবাদমাধ্যম সর্বত্র ছবিতে কালি মাখানো ছেলেগুলো আলোচনার কেন্দ্রে। তাদের নিয়ে নিন্দা হচ্ছে, বিশ্লেষণ হচ্ছে, বিতর্ক হচ্ছে। বেশ! কিন্তু যে বক্তব্য তাদের এমন কাজের প্রেরণা জুগিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে, সেই বক্তব্যের দায় নিয়ে আলোচনা কোথায়?

কালি মাখানো হাত দৃশ্যমান, কিন্তু সেই হাতকে প্রভাবিত করা কথাগুলো কি অদৃশ্য?

এখানেই গল্পটা একটু রহস্যময়। কাজটি যারা করেছে, তারা আলোচনায়। অথচ কাজটির পেছনে যে বক্তব্যের ভূমিকা থাকতে পারে, তার বক্তা যদি আলোচনার বাইরে থেকে যান, তাহলে কি আমরা শুধু অপরাধের দৃশ্যটাই দেখছি, নাকি দৃশ্যের বাইরের চিত্রনাট্যটি দেখতে চাইছি না?

রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় এটা তাঁর পরিচয়ের একটি তথ্য। কিন্তু সেই পরিচয়কে বর্জনের যুক্তি বানানো মানে কি নিজের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকেই সংকুচিত করা নয়? রবীন্দ্রনাথকে মানতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই; কিন্তু তাঁকে বাতিল করার যুক্তিটাও তো যুক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

আর বুদ্ধিজীবীদের কাছেও প্রশ্ন: আপনারা কি শুধু কালি মাখানো হাতের বিচার করবেন, নাকি সেই হাতকে কোন চিন্তা প্রভাবিত করল, সেটাও খতিয়ে দেখবেন? নাকি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে দৃশ্যমান ছেলেগুলোকে নিন্দা করা নিরাপদ, আর দৃশ্যের নেপথ্যের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিছুটা অস্বস্তিকর?

কালি মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু যে চিন্তা কালি মাখানোকে বৈধতা দেয়, তার বিচার না হলে দেয়াল পরিষ্কার হবে, চিত্রনাট্য নয়।

রবীন্দ্রনাথকে ব্রাত্য করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কারা ব্রাত্য হয়ে গেল, আর কারা আলোচনার কেন্দ্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে রইল…সেই হিসাবটাও আসুন একটু করি।” তবে সে হিসেব করলে কিন্তু বাংলাদেশী বাঙ্গালীরা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

# ইশরাত জাহান: লেখক, প্রাবন্ধিক, নারী অধিকার সংগঠক। 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *