২০০১ সালের ১ অক্টোবরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী অস্থির-সাম্প্রদায়িক শ্বাপদশংকুল পরিস্থিতি দেশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তখন সারাদেশে অমানবিক অত্যাচার-নিপীড়ন-খুন-ধর্ষণ-ঘরবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া চলছে।
হিন্দুদের অনেকেই দিশেহারা হয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে চলছে। কেউ কেউ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে, কেউ চেষ্টা করছেন চলে যাওয়ায় জন্য।
তাদের পেছনে পড়ে রইলো চৌদ্দ পুরুষের ভিটে-মাটি। সম্পত্তি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আবার কেউ গ্রাম ছেড়ে বিভিন্ন শহরে আত্মীয় স্বজনের বাসাবাড়িতে একটু আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করছেন।
অসহায় মা-বাবা তাদের কন্যাসন্তানকে, ঘরের তরুনী বউকে একটুখানি নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার জন্য হন্যে হয়ে উদভ্রান্তের মত ঘুরছে..। এমন আরো নানা অমানবিক চিত্র সারা বাংলাদেশে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সংখ্যাধিক্য ভোটে জিতেছিল সেবার। আর জেতার পরই সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ অত্যাচার-নিপীড়ন।
এই যখন দেশের অবস্থা তখন হঠাৎই সংবাদপত্রের পাতায় একটি ছবি আর সে সংক্রান্ত সংবাদের দিকে চোখ গেল।
আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তাতে দেখেছিলাম ইংরেজীর খ্যাতিমান অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ও আরেকজন বাংলার সাবেক অধ্যাপক ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সর্বাধিনায়ক আবদুল্লাহ আবু সাইয়ীদ এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছেন।
প্রয়োজন হলে তাদের কেটে ফেলুক বৃক্ষনিধনকারীরা কিন্তু তাঁরা কিছুতেই বৃক্ষ নিধন হতে দেবেন না। এটিই ছিল মূল বিষয় সেই ঐতিহাসিক ছবি ও প্রতিবেদনের মূল ভাষ্য।
কিন্তু সারাদেশে যে হিন্দু সম্প্রদায়সহ অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর এতসব অত্যাচার চলছে, হিন্দুরা প্রাণভয়ে-সম্ভ্রমের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তাতে এই দুই গুণী (!) অধ্যাপক ও সুশীল সমাজের অন্যতম প্রতিনিধির কোন বিকার নেই।
তাদের কাছে তখন মুখ্য বিষয় হলো – বৃক্ষ নিধন রোধ, পরিবেশ রক্ষা। কারণ বৃক্ষইতো আমাদেরকে অক্সিজেন দেয়।
অক্সিজেনেইতো আমাদের জীবন চলে, শ্বাসপ্রশ্বাস চলে। তাই। যুক্তি অকাট্য। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো যে মানুষের জন্য এই অক্সিজেনের প্রয়োজন বেঁচে থাকার জন্য, সেই মানুষইতো বাঁচতে পারছিলনা তখন। মানবতা যেখানে ভুলুন্ঠিত সেখানে আগে মানুষ বাঁচানো জরুরি না গাছ বাঁচানো?
তার উত্তর কিন্তু এই দুই স্বনামখ্যাত অধ্যাপক দেননি কখনো। কারণ তাদের কাছে বৃক্ষনিধন রোধ করাটাই জরুরী। মানুষ থাকলো কি মরলো তাতে তাদের কী?!
সত্যিইতো তাই। কারণ আবু সাইয়ীদ তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দিয়ে সারাদেশে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন ।
সারাদেশের নাগরিকদের মধ্যে তিনি জ্ঞানের আলো বিতরণ করে তাদেরকে এনলাইটেন করে তুলতে প্রান্ন্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই জ্ঞান বিতরণের ফলে এমনই অবস্থা হয়েছে যে, সেই কিশোর-ছাত্র-তরুন-যুবক এমনকি পরিণত বয়সের নাগরিকরা অন্ধকারাচ্ছন্ন এক জীবনের সন্ধান পেয়েছেন। যার পরিণতিতে ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টে ‘ইসলামী জঙ্গী-সামরিক ক্যু’ ঘটলো। এসব নিয়ে এই অধ্যাপকতো বেজায় খুশী।
অপরদিকে এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম তিনিও জ্ঞান বিতরণ করে চলেছেন সমাজের নানাক্ষেত্রে। তার কাছেও সেদিন দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি যে চরম সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস চলছিল তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ ছিলনা। তিনিও বৃক্ষপ্রেমী মানুষ। অত্যন্ত জ্ঞানী শিক্ষক।
সে ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তো সেই অপরিসীম জ্ঞান দিয়ে মানুষ কি করবে, যদি মানুষই না থাকে ? কিন্তু এমন দুই জ্ঞানী অধ্যাপকের কাছে সেদিন বা তার পরেও বোধ হয় মানুষের চেয়ে বৃক্ষ রক্ষার মূল্য অনেক বেশি। তা হতেই পারে।
পাঠক হয়তো ভাবছেন হঠাৎ করে আবার সেই ২৫ বছর আগের কথা কেন বলছি ? মনে পড়লো এজন্য যে –আবার সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আলোচনায় এসেছে।
যে বিষয়ে এ উদ্যান আবার আলোচনায় এলো তা হলো সেখানে অবৈধভাবে মসজিদ বানানোর প্রসঙ্গ নিয়ে।

বৃক্ষ নিঃসৃত অক্সিজেনের জন্য রাজধানীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত এই উদ্যান। তবে তারচেয়ে বড় পরিচয় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী এই ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
সাম্প্রতিক সময়ে উদ্যানের ভেতরে “অবৈধভাবে এবং হঠাৎ করে” গড়ে ওঠা একটি অস্থায়ী নামাজের জায়গা বা কথিত মসজিদ বানানোর পায়তারা করছিল একদল কথিত মুসল্লি।
পরবর্তীতে ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে সরকারি কয়েকটি সংস্থা যৌথ অভিযানে সেটির উচ্ছেদ করে।
এসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এক গাঁজাটি রাজিব শাহ নামক এক ব্যক্তির উদ্যোগে ত্রিপল, ইট ও জায়নামাজ দিয়ে তৈরি এই স্থানটিকে কেন্দ্র করে যে প্রতিবাদের ভাষা এবং আইনি পদক্ষেপ দেখা গেছে, তা বর্তমান বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক, ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতার এক জটিল রূপরেখাকেই উন্মোচন করে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চ বা এম্পিথিয়েটার সংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ করেই একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নামাজের স্থান তৈরি করে এবং সেখানে স্থায়ী মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং সরাসরি উদ্যানে এসে কিছু সাধারণ তরুণ, কিশোর ও সচেতন নাগরিক এর তীব্র প্রতিবাদ জানান।
এরমধ্যে সদ্য কিশোর উৎরানো তরুণ সেই মসজিদ তৈরীর উদ্যোক্তাদেরকে প্রচন্ড প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
সে নানাভাবেই বলতে থাকে- ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী, জোরপূর্বক বা অনুমতিহীন বিতর্কিত জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা ধর্মীয়ভাবেও সমর্থনযোগ্য নয়।
টুপি-দাঁড়িওয়ালা হুজুর টাইপের এক ব্যক্তিতো রীতিমতো ওই তরুণকে নানাভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছে। এমনকি তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে থাকে।

মোটামুটিভাবে একটি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরী করার সবধরনের অপচেষ্টা ওই মোল্লা টাইপের লোকটি করেছিল।
এখনকার সমাজ বাস্তবতার মধ্যে প্রতিবাদী সেই তরুণ ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছে তাতে সত্যিই আবার নতুন করে ভাবতে শেখায় আমাদেরকে।
সে উত্তর দিয়েছিল ‘ আমি আগে মানুষ’ তারপর অন্যসব। এই যে আমাদের চিন্তাচেতনাকে যে চেপেটাঘাত করেছে ওই তরুণটি তাতে বোধ হয় আমাদের শিক্ষা হওয়া উচিত।
এই যে ‘ মানুষ’ শব্দটি উচ্চারণ করে আমাদের সবার চিন্তার যে উদ্রেক করে দিয়েছে তরুণটি তা অন্তত আমাদেরকে আবার নতুন করে ভাবতে শেখাবে।
উল্লেখ্য, সরকারি একটি হেরিটেজ ও পাবলিক পার্কে এভাবে জায়গা দখল করা আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু এদেশের কাঠমোল্লারা তা মানতে চায়না কখনো। তারা তাদের ধর্মীয় ব্যবসা খোঁজে।
অথচ এই উদ্যানের ঠিক অদূরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং তিন নেতার মাজার সংলগ্ন বড় মসজিদ রয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের নিজস্ব একটি আধুনিক মসজিদও উদ্যানের ভেতরে বিদ্যমান। ফলে নতুন করে আরেকটি স্থাপনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
প্রতিবাদী তরুণের অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল—সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একটি জাতীয় ঐতিহ্য ও সর্বজনীন পার্ক। এখানে যদি আজ কেউ নিয়ম না মেনে জোরপূর্বক মসজিদ করে, তবে কাল অন্য ধর্মের মানুষও সেখানে মন্দির বা গির্জা তৈরির দাবি তুলবে।
ফলে এটি কোনো ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়, বরং পার্কের উন্মুক্ত প্রকৃতি রক্ষার বিষয়।
স্থানীয় মানুষ এবং গণপূর্ত বিভাগের তদন্তে দেখা যায়, মূল উদ্যোক্তা রাজিব শাহের এই কর্মকাণ্ডের আড়ালে উদ্যানের জায়গা দখল এবং রাতে ভাসমান অপরাধ বা মাদকের আসর জমানো।

কিশোর-তরুণেরা এই ছদ্মবেশী ধর্মীয় আবেগের বাণিজ্যিকীকরণ ও রাজনীতিকীকরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন।
এই ঘটনাটি বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তোলে। বর্তমান সমাজে যেকোনো বিষয়ে ‘ধর্মীয় লেবাস’ বা ‘আবেগ’ যুক্ত করে দিলে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ অন্ধভাবে সেটিকে সমর্থন করতে শুরু করে।
রাজিব শাহ নামের ব্যক্তিটি প্রথমে চাষাবাদ এবং পরে নামাজের জায়গা তৈরি করে সাধারণ মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা বা ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করার চেষ্টা করেছিলেন।
সমাজ বাস্তবতায় দেখা যায়, বহু জায়গায় অবৈধ দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে ধর্মের নাম ব্যবহার করা হয়, যা প্রকৃত ইসলাম চর্চার পরিপন্থী।
কিন্তু প্রতিবাদী তরুণ প্রজন্মের সচেতনতা ও নাগরিকতাবোধ আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো – প্রতিবাদী হও, নাহলে বিপদ আছে ভয়াবহ রকমের।
এই ঘটনার ইতিবাচক দিক হলো, এদেশের একদল আধুনিক, সচেতন কিশোর ও যুব সমাজ অন্ধ আবেগে ভেসে যায়নি। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়মতান্ত্রিকতা এবং পরিবেশ সুরক্ষার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, ধর্মের নামে যত্রতত্র বেআইনিভাবে জায়গা দখল করা এক ধরণের ভণ্ডামি। তরুণদের এই যৌক্তিক অবস্থান প্রমাণ করে যে, সমাজে নাগরিক অধিকার ও যুক্তিভিত্তিক চিন্তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ডিএমপির যৌথ উদ্যোগে কোনো বড় ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।
রাষ্ট্র বা প্রশাসন ধর্মের দোহাইয়ে আইনি ব্যত্যয়কে ছাড় দেয়নি, যা আইনের শাসন এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই ঘটনাটি কেবল একটি ‘অবৈধ নামাজের স্থান উচ্ছেদের’ গল্প নয়, এটি আমাদের জাতীয় জীবনের একটি প্রতীকী চিত্র। একটি প্রতিবাদের চিত্র। তা হরেঅ যেকোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে সোচ্চারভাবে ও জোরালো ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে একটি গোষ্ঠী বা মহল যেকোনো উন্মুক্ত ও ঐতিহাসিক স্থানকে নিজস্ব ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে সচেতন নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্র এই সর্বজনীন স্থানগুলোকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে চাইছে।
প্রতিবাদী কিশোর ও তরুণদের কণ্ঠস্বর এবং প্রশাসনের এই উচ্ছেদ অভিযান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে আবেগের চেয়ে ‘যুক্তি’ এবং ‘আইনের শাসন’ অনেক বেশি জরুরি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সম্পদকে সব ধরণের অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত রেখে এর আদি ও প্রকৃত রূপ ধরে রাখাই এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তবেই একটি সত্যিকারের প্রগতিশীল, বৈষম্যহীন এবং নিয়মতান্ত্রিক সমাজ বাস্তবতার রূপান্তর সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ও সমাজ সচেতন নাগরিক ইমতিয়াজ মাহমুদ লিখেছেন-নগরীর পার্ক, খোলা মাঠ, বৃক্ষ ইত্যাদি রক্ষার জন্যে যারা আন্দোলন করেন, ওরা ভালো কাজই করেন।
পরিবেশ আন্দোলন তো সাধারণভাবে ভালো কাজই। কয়েকজন লোক পার্কের মধ্যে মসজিদ বানিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দখল ও বিনষ্ট করার পাঁয়তারা করছে, এটার বিরুদ্ধে এরা কিছু বলছেন না কেন? আমি একটু বিস্মিত হয়েছি ওদের নীরবতা দেখে। সেইসব এক্টিভিস্টের নাম বললাম না, আপনারা চেনেন। আপনার কি ধারণা? এই ক্ষেত্রে ওরা একদম চুপচাপ হয়ে আছে কেন?
কবি-প্রাবন্ধিক কামরুল হাসান বাদল তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বললেন-“ এ দেশে আমরা যারা ষাট, সত্তর ও আশির দশকে বড় হয়েছি তাদের মধ্যে অধিকাংশই এই তরুণের মতো ভাবতাম।
কারণ তারুণ্যের ধর্মই হচ্ছে সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা, প্রথার বিরুদ্ধে বলা, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতাকে প্রতিহত করা, আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতাকে ধারণ করা। মানবিক হওয়া।
কিন্তু গত কয়েক দশকে তা না হয়ে তারুণ্য ক্রমশ রক্ষণশীল হয়েছে, অধিকতর মুসলমান হতে হতে, হিন্দু হতে হতে, বৌদ্ধ হতে হতে মানুষ হবার কথা ভুলে গিয়েছে। এরমধ্যে যখন এ ছেলেটি বলল, আমি আগে ‘ মানুষ ‘ তখন বহুদিনের নীরবতা ভেঙে অনেক কণ্ঠস্বর জেগে উঠে একযোগে বলল, আরে তাই তো, আমি তো আগে মানুষ!
এই উদ্যানেই একদিন মুক্তির মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছিল। এখান থেকে আবার মানবতার জয়যাত্রা শুরু হোক। মানুষের জয় হোক। মানবতার জয় হোক।”
মানবতার জয় হোক সেটিতো আমরা সবাই মুখে বলি। কিন্তু সেই মানবতা আবার একেক জনের কাছে একেক রকমের সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা। আমরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মাধ্যমে অর্জিত যে মানবাধিকার ও মানবতা সেটিরই বাস্তবায়ন চাই।
কোনভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চরম শত্রু পাকহানাদার বাহিনীর সহযোগী আমেরিকান মানবাধিকার বা মানবতা চাইনা। কারন যে মানবতা অঅমাদের দেশকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে, মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়িয়েছে প্রচন্ড, তৈরী করেছে ও বিদ্বেষ-হিংসা হানাহানি সে মানবতা আমাদের প্রয়োজন নেই।
সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে আবার নিশ্চয়ই এদেশের কিশোর-ছাত্র-তরুণ-যুব সমাজ জেগে উঠবে। আজো সেই আশা দেখতে পাই। আলো আসবেই। সে আলো বহন করবে নতুন প্রজন্ম। ধর্মব্যবসায়ী-ধর্মান্ধ অপগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আবার লড়াইয়ের প্রস্তুতি দেখতে পাচ্ছি বোধহয়।
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
