হায়রে জুলাই! এ তোমার কি করুণ দশা ! কে করলো! যারা মাত্র বছর দুয়েক আগে কথিত কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ধ্বংস করেছিল তারা ! নাকি আর কেউ?

জুলাই এখন দেশবাসীর কাছে ‘ঝুলাই’ হয়ে গেছে। একটি মাসের নামও সেই ‘মার্কিন ডিপষ্টেট ‘ ও ‘ইউনুসের মেটিক্যুলাস ডিজাইন’ এর নীলনকশার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে কেমন ঘৃণ্য হয়ে গেল!

আর কিছু নাহোক এই ‘ঝুলাই’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি অসভ্য-বর্বর-বেয়াদপ-ইতর জাতি বা সমাজ পেয়েছি আমরা। এটিই মূল পাওয়া এ জাতির ভাগ্যে!!

কারণ তা না হলে অসভ্য-অশ্লীল শ্লোগান আর ইতরামির চূড়ান্ত বেয়াদপ হাদিকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে এই দেশে। এমন অশ্রাব্য ভাষায় উত্তেজক গালিযুক্ত শ্লোগান দেয়া হাদীকে কিনা কবর দেয়া হলো জাতীয় কবি-অসাম্প্রদায়িকতার কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে!

এসব ঘটনা ও প্রশ্নের উত্তর নানাভাবেই খুঁজছেন এখনো অনেকে। কারণ সেটি ছিল একাত্তরের পরাজয়ের চরমতম প্রতিশোধ। আর সেই প্রতিশোধ হিংস্র হায়েনার দল নিয়েছে নানা সময়ে।

একাত্তর থেকে শুরু করে আজ ২০২৬ এসেও সেই পাকি ঘাতক জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ইসলামপন্থী দোসররা। সাথেতো অবশ্যই তাদের মোড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

কি বিচিত্র এদের রাজনীতি দেখুন। মার্কিনীরা বলেছে-বলছে ও বলবে যে, ইসলামী জঙ্গীবাদকে তারা ঘৃণা করে। কিন্তু বিশ্বের নানা জায়গাতেই তারা এই জঙ্গীবাদী ইসলামকেই পেট্রোনাইজ করে তাদের কাজ হাসিল করে নেয়।

তা সেই আফগানিস্তান বলুন, মধ্যপ্রাচ্য বলুন একই কাজ করেছে এই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

সাপ হয়ে দংশন করে প্রাণহরণ করে ঠিকই, কিন্তু ভাব দেখায় ওঝা হয়ে বিষ ঝাড়ার। তারাই আবার গণতন্ত্রের সবক দেয় বিশ্ববাসীকে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে নিজেরাই সন্ত্রাস করে বেড়ায়।

সন্ত্রাসীদের লালন-পালন করে। আসলে সে তার নিজের ঘৃণ্য স্বার্থ হাসিল ছাড়া আর কিছুই বোঝেনা।

অসংখ্য প্রশ্ন মানুষের মনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা বিকৃত তথ্যের পাশাপাশি কিন্তু মানুষের মনের অনেক কথাই প্রতিফলিত হয়। সেটিকেতো আর অস্বীকার করা যাবেনা। অনেকেই তাই বলছেন—জুলাইতো আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশকেই বিবেকের কাঠগড়ায় ঝুলিয়ে দিয়েছে?

জুলাই আমাদের কী দিয়েছে? কোটামুক্ত বাংলাদেশ? দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র? শোষণমুক্ত সমাজ? বাকস্বাধীনতা? আইনের শাসন?অর্থনৈতিক মুক্তি? সামাজিক উন্নয়ন?আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা? নিরাপদ জনজীবন? নূন্যতম মানবাধিকার? কোথায় সেগুলো?

যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, আজ তা কি বাস্তব—নাকি শুধুই মিথ্যা আশ্বাসের জাল?
দেশ কি এগিয়েছে, নাকি পিছিয়ে গেছে?
মানুষ কি স্বস্তিতে আছে, নাকি আতঙ্কে?
চোখ খুলে দেখুন, সত্যটা বুঝুন।

সময় এসেছে প্রশ্ন করার, জবাব চাওয়ার।
কারণ ইতিহাস কখনো মিথ্যাকে ক্ষমা করে না। এমন হাজারো প্রশ্ন হাজারো অব্যক্ত যন্ত্রনার অনুভূতি নিয়ে মানুষ ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে।

চব্বিশের সেই ভয়াল দিনগুলোর শেষদিকে বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইমারজেন্সি দিয়েছিলেন দেশে।

কিন্তু সেই বিশেষ জরুরী আইন ভঙ্গ করে গণভবনে অবাধে লোক প্রবেশ করতে দিয়েছিল কারা? নিশ্চয়ই বাংলাদেশের পাকিপন্থী সেনাবাহিনী।

চব্বিশের ৫ আগষ্ট যে কথিত গণঅভ্যুত্থান তা আসলে ছিল একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি পাক-মার্কিনীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ইসলামী জঙ্গীদের একটি আর্মি ক্যু।

বিএনপি নেত্রী ও এখনকার সংসদে বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি কিন্তু টিভি টকশোতে অনেক কিছুই বলে ফেলেছেন।

তিনি যেসব কথা বলার চেষ্টা করেছেন তা হলো- যাদেরকে বলা হয় তারাই মেইন; তারা কখন, কোথায়, কিভাবে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করেছে, তাদের কতটুকু ভূমিকা ছিল এই আন্দোলনে?

আমি ( নীলুফার মনি) মুখ খুললে অনেকের কাপড়-চোপড় নষ্ট হয়ে যাবে।

এই আন্দোলনে কারা যে মেইন ছিল, কেউ বলতে পারবেনা। একজন অন্যজনকে চিনে নাই, কাজগুলো এভাবেই হয়েছে। একসাথে মিছিলে গিয়েছে, সামনের জন পড়ে গিয়েছে, পিছনের জন বলতেও পারেনা!

গুলির শব্দ নাই স্নাইপারের গুলি ছিল, গুলি সামনে থেকে এসেছে, নাকি পিছন থেকে মারা হয়েছে তাও কেউ জানে না।

সামনে কোন পুলিশ নাই কিন্তু মিছিলে গুলি ছোঁড়া হয়েছে! হয়তো কোন উঁচু ভবনের ছাঁদ থেকে টার্গেট করে গুলি করে ছাত্র-জনতাদের হ’ত্যা করা হয়েছে।

অনেক প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেও মিলাতে পারি না, আমি হতভম্ব হয়ে যাই! তবে জুলাই কোন আন্দোলন ছিল না, এটা ছিল সুক্ষভাবে পরিচালিত ডিজাইন।

নীলুফার মনি এমনটাই বলছিলেন টিভি টকশোতে। তারমানে কি? মানে হলো- বিএনপিও রাজনৈতিকভাবে ধোঁয়াশার মধ্যে ছিল। এখনো তাই।

কারণ সবটাই পাকা কুচক্রীর নীলনকশা অনুযায়ী হয়েছে। নানা কারণে বিএনপি আজ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে ক্ষমতায়। কিন্তু জামায়াতীরা নেপথ্যে থেকে সবকিছুই কলকাঠি নাড়ছে।

সেই চব্বিশের কথিত কোটা আন্দোলন যা সরকার পতনের আন্দোলনে রুপান্তরিত করা হলো প্ল্যান অনুযায়ী তাতো জামায়াত আর সেনাবাহিনী বেশ কৌশলে করে ফেলেছে।

ক্ষমতায় বিএনপি রয়েছে ঠিকই কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ঠিকই সেনানিবাসের আওতাধীন শিখা অনির্বাণ বন্ধ করাতে বাধ্য করেছে।

খুব শীঘ্রই শিখা চিরন্তনও বন্ধ হবে, অথবা হয়ে গেছে আমাদের অনেকের অজান্তে। কারণ এসব সিম্বলে তাদের বড় জ্বালা। এসব দেখলে তাদের পরাজয়ের করুণ ইতিহাস বার বার খোঁচা দেয় হৃদয়ে। তাই এসব বন্ধ করা তাদের জন্য ফরজ হয়ে গেছে।

শিখা অনির্বাণ করা হয়েছিল ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে। যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর সৈনিকদের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গীকৃত।

অপরদিকে শিখা চিরন্তন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত, যা ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে স্থাপিত।

তো এই শিখা অনির্বাণ কিন্তু একসময়ে মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও পরে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধন করেছিলেন।

আর সেই মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের পুত্র এখনকার প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তার পিতার উদ্বোধনকৃত শিখা অনির্বাণ নিভিয়ে দিলেন। বাহ ! কি চমৎকার! তাই না?

মুক্তিযোদ্ধা পিতা মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর সৈনিকদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাকে অটুট রাখতে শিখা জ্বালালেন। আর পুত্র সেই চেতনাকে কবর দিলেন। তবে এই শিখা অনির্বাণ বন্ধ করার বিষয়টিও অনেক পরে জানানো হলো সশস্ত্র বাহিনীর জনসংযোগ শাখা থেকে।

যেখানে সেনানিবাসের ভেতরের শিখা অনির্বাণ বন্ধ করে দিতে পেরেছে জামায়াতীরা সেখানে শিখা চিরন্তন জ্বলবে তা কি করে হয়? আরো এটি তো বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজরিত স্থানে। পাকবাহিনীর আত্মসমর্পনের স্থানে। সুতরাং এটি চালু থাকতে পারেনা বা দেবেনা জামায়াতীরা।

অবশ্য সেই বাইচান্স মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান ও সেনাছাউনিতে সৃষ্টি করা তার রাজনৈতিক দল বিএনপি’র খালাতো ভাই জামায়াতে ইসলামী। মাঝে মধ্যে তা একটু খালাতো ভাইদের মধ্যে একটু ঠোকাঠুকি লাগে আরকি, এর বাইরে তেমন কিছু নয়।
শুধু অপেক্ষা শিখা চিরন্তন বন্ধ করার।

যে কোন সময়েই ঘোষণা আসবে, এটি হয়তো আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি। কারণ আমীরে জামায়াত ওই সাদা শকুন ডা. শফিক হতে পারেন কিন্তু তার সিপাহসালার বা আমীরুল মুজাহিদীন তো জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। সুতরাং আর চিন্তা কিসের?

কারণ আমার কাছে সেই চব্বিশের ৫ আগষ্ট ওয়াকারুজ্জামানের সেই সব শব্দগুলো এখনো কানে লেগে রয়েছে। তা হলো- ‘আমীরে জামায়াত’ সম্বোধন। মূলত এই জাতীয় শব্দ শুধুমাত্র জামায়াতের নেতাকর্মীরাই বলে থাকেন।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে নতুন একটি ব্যাটেলিয়নের অধীনে চারটি নতুন কোম্পানি করা হয়েছে ইসলামের চার খলিফার নামে।

মানে দাঁড়ালো সেনাবাহিনীকে ইসলামীকরণের সব কাজই সম্পন্ন হলো এর মধ্য দিয়ে। শুধু বাংলাদেশের নামটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর পরিবর্তে ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাখা বাকি আছে।

বাংলাদেশ সেনাবহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল মুস্তাফিজের মেয়ের জামাতা এই ওয়াকারুজ্জামান, যিনি আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বোনজামাই। তো এই বোনজামাইকে সেনাপ্রধান বানিয়েছেনতো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই। তো সেই প্রতিদানও তিনি পেয়েছেন।

ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশ থেকে বহিষ্কার। ইসলামী নেতৃত্বের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে আমরা এমন বিশ্বাসঘাতকতার ভুড়ি ভুড়ি উদাহরন পাবো। সে প্রসঙ্গে না গেলাম আর।
এর সব কিছুই ওই ‘ঝুলাই’ আন্দোলনের অংশ হিসেবেই করা হয়েছে। যেসব সু-শীল এই ‘ঝুলাই’ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তারা নিজেরাই পস্তাচ্ছে তাদের কৃতকর্মের জন্য।

এই সব সুশীলদের মিডিয়া প্রধান ‘মাহফুজ-মতি’ গ্রুপের কাজ নিয়ে লিখতে গিয়ে সাংবাদিক ইশতিয়াক রেজা মোটামুটি একটু সমালোচনামুখর হয়ে উঠলেন। তিনি ডয়চে ভেলেকে দেওয়া প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের সাক্ষাৎকারটি অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ।

তার বক্তব্যের সারকথা হলো- প্রথম আলো-ডেইলি ষ্টারে হামলার সময় সরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর সহায়তা পাঠায়নি।

সরকারের ভেতরে প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ছিল এবং সবচেয়ে বড় কথা, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সেদিন ডেইলি স্টারের ২৮ জন সাংবাদিক প্রাণভয়ে ছাদে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভাগ্যগুণে তাঁরা বেঁচে গেছেন। কিন্তু যদি কোনো বড় বিপর্যয় ঘটত, তবে এর দায় কি একজন নোবেল বিজয়ী সরকার প্রধান এড়াতে পারতেন?

অর্থাৎ প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের মতো নিজের সমর্থক পত্রিকাকেও ইউনূস সরকার সময়মতো সুরক্ষা দিতে পারেনি। এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন হামলা নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, সরকারের সদিচ্ছা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।

গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা তো এখানেই যে, গণমাধ্যম আক্রান্ত হলে সরকার কী ভূমিকা নেয়। আর এই পরীক্ষায় ড. ইউনূস ব্যর্থ হয়েছেন।

সাংবাদিক ইশতিয়াক রেজা বলেছেন- মতিউর রহমানের এই সাক্ষাৎকারটি অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে। কারণ, এতে ক্ষমতার নীরবতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতার এক কঠিন সাক্ষ্য রয়েছে।

বাই দ্যা ওয়ে – সাংবাদিকতার শিক্ষকরাও এই ঘটনাকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণের সবচেয়ে বড় এভিডেন্স হিসেবে ধরে নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। বিষয় হতে পারে – “যারে পত্রিকা দুটি আব্বা ডাকল, সেও বাঁচাইল না”।

#রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *