কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক কট্টর ইসলামী সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামে অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও তাদের কাজকর্ম পুরোটাই চরমভাবে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক।
শুধু তাই নয় এরা চরমভাবে নারী স্বাধীনতা বিরোধী ও নারীর ক্ষমতায়নেরও প্রচণ্ড বিরোধী। কিন্তু এই সংগঠনই তাদের ভাষায় ফ্যাসিবাদী ও ভারতীয় দালাল শেখ হাসিনা কে ‘কওমী জননী’ বা ‘ কওমী মাতা’ উপাধি দিয়েছিল।
এরা চরমভাবে ভারত বিরোধী ও হিন্দুবিদ্বেষী হলেও উচ্চশিক্ষার জন্য কওমীদের হেডকোয়ার্টার ভারতের দেওবন্দে চলে যান।
আবার চিকিৎসার জন্য, ব্যবসার জন্য ভারতে দৌড় দেন যখন তখন। তখন আর ভারত বিরোধীতা তাদের মাথায় থাকেনা।
আওয়ামীলীগ তথা শেখ হাসিনা থেকে নানা সুযোগ সুবিধা নিয়ে এই হেফাজতে ইসলামী কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের জন্য হেন কোন কাজ নেই যা তারা করেনি। আবার তাদের হুজুরদের সাথে বিএনপি’র কান্ডারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকেও নানা সুবিধে নেয়ার ধান্ধায় আছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামী আলেমদের প্রতিনিধি রাখাসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

ফলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমান তাদের দাবিদাওয়া সম্পর্কে বলেছেন- “আমি একজন মুসলমান এবং এটা মুসলিম রাষ্ট্র। কাজেই ইসলামবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড, কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড অতীতেও আমাদের সরকারের আমলে হয় নাই, ইনশাল্লাহ সেটা আমার সরকারের আমলেও হবে না।”- এ তথ্যটি বিবিসি বাংলার সূত্রে পাওয়া।
তার মানে কি দাঁড়ালো- তারেক রহমান বলেছিলেন, এদেশে সব মানুষের সমান অধিকার। তো বাংলাদেশ যদি মুসলিম রাষ্ট্রই হয় তাহলে অন্য ধর্মের নাগরিকদের সমান অধিকার কি করে রক্ষা হয় সে প্রশ্নের জবাব কি দেবেন জনাব তারেক রহমান সাহেব ? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর কোন জবাব আপনার নেই তা বুঝতে পারি।
চরম স্ববিরোধী আচরণ ও কর্মকাণ্ডের জন্য প্রচণ্ডভাবে সমালোচিত হেফাজতে ইসলাম নামের এই সাম্প্রদায়িক সংগঠনটির কাছেই কিন্তু বাংলাদেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা দৌড় দেন।

তাদের সংগঠনের যিনি আমীর থাকেন তার কাছে মাথা নত করে দোয়া (!!) নিতে কসুর করেন না। তা সেই আওয়ামীলীগ বলি আর বিএনপি বলি আর অন্য দলগুলোর কথাই বলি।
বাংলাদেশে আমরা মুসলমানরা মূলত কওমী সিলসিলা ও সুন্নী সিলসিলা –এই দুইটি বড় ভাগে বিভক্ত।
এর বাইরেও কিছু সিলসিলা আছে, তবে তারা খুব বেশি শক্তিশালী নয়। তবে রাজনীতিতে ভোটের আগে-পরে এই সব ইসলামপন্থী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বড় দুইটি দলকে নতি স্বীকার করতে দেখা গেছে।
অতীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ যেমন করেছে তেমনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিও করেছে। আবার সেই ধারাবাহিকতায় খালেদাপুত্র ও এখনকার বিএনপির কাণ্ডারি ও বাইচান্স বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাই করছেন।
বাংলাদেশের পচাগলা রাজনীতিতে এটিই স্বাভাবিক। এখানে ইসলামের নামে, মুসলিম সম্প্রদায়ের নামে নানা ধরনের কায়েমী স্বার্থের রাজনীতি বেশ সক্রিয়।
ইসলামের নামে রাজনীতি শতভাগ বৈধ, কিন্তু অন্য সম্প্রদায়ের বা ধর্মের নামে রাজনীতিতো দূরের কথা তারা তাদের অধিকারের কথাও বলা অনেকটা নিষিদ্ধ।
অধিকারের কথা বললেই নানা দোষ খুঁজে বেড়ানো হয়। অন্য কোন দেশের ইন্ধনে করছে এমন অজুহাত তুলে তাদেরকে জেল-কারাগারসহ নানা হুমকির মধ্যে ফেলা হয়। এটিই হলো নির্মম বাস্তবতা।
গত ৯ আগষ্ট বিএনপির কাণ্ডারি ও এখনকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামে সরকারি সফরকালে এই হেফাজতের আমীরে পাক হুজুরসহ অন্য সিনিয়র নেতা বা হুজুরদের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের দোয়া নিয়েছেন।
তাদের সবক শুনেছেন, হেফাজতের ৯ দফা দাবিদাওয়া অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে শুনেছেন একান্ত বাধ্যগত ছাত্রের মত।
সংবাদ মাধ্যম থেকে যতটুকু জেনেছি তা হলো- ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজত আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এছাড়া হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের প্রয়াত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান।
আমরা এখনকার রাজনৈতিক ময়দানে দেখছি যে- জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধীদল যখন সরকারবিরোধী আলোচনায় মুখর, ঠিক তখন হেফাজতের সঙ্গে বৈঠক করতে দেশের সরকারপ্রধান ছুটে গেলেন ফটিকছড়িতে।
বিষয়টিকে বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে সৌজন্যতা বলা হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি দেখছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।
কারণ অতীতে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতকে ঠেকাতে হেফাজতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছে।
এবারও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের সাম্প্রতিক হুমকি-ধমকিতে তারেক রহমান হেফাজতকে নিজেদের আয়ত্তে রাখতে চান কিনা, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
অনেকে মনে করেন, জামায়াতের আকিদাগত বিভিন্ন বিষয়গুলো হেফাজতের মধ্যে প্রচার করে সরকার জামায়াতকে দুর্বল করার পরিকল্পনা নিয়ে থাকতে পারে। আবার হেফাজতই যে সব সময় তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সে ধরনের কোনও নিশ্চয়তাও নেই।
কারণ অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও শেখ হাসিনার সরকারকে হঠাতেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে হেফাজত।
কারণ এই হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠনটি অনেকটা জামায়াতের মতই মোনাফেক। এরা কথা উল্টে ফেলতে বা তাদের নিজেদের কথাই অস্বীকার করতে একবিন্দু দ্বিধা করেনা।
চরম পাল্টিবাজ ও মিথ্যাশ্রয়ী সংগঠন এই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামের দল ও তাদের নেতা বা হুজুরেরা। এক কথায় এরা হলো চরম অকৃতজ্ঞ ও কৃতঘ্ন সংগঠন।
বিগত আওয়ামীলীগের আমলে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমী জননী’ উপাধি দিয়ে তাকে চরমভাবে তোষামোদ করেছে।

আবার তাদের কথামতো না চলাতে আওয়ামীলীগ-মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল রাজনীতি ও মতামতের বিরুদ্ধে সংগঠিত চরম নৈরাজ্য করতেও দ্বিধাবোধ করেনি।
আওয়ামী লীগকে তারাই আবার ইসলামবিরোধী বলে চরমভাবে গালিগালাজ করেছে, যা এখনো অব্যাহত আছে।
পাঠকের নিশ্চয় মনে থাকার কথা ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এ সংগঠনটি আলোচনায় আসে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে কর্মসূচির মাধ্যমে।
এছাড়া আওয়ামীলীগ আমলে জাতীয় নারী নীতি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের প্রচণ্ড বিরোধীতা করে সারাদেশে তারা তাণ্ডব চালিয়েছিল এই ইসলামের নামে। আর তাতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এই হেফাজতকে নানাভাবে মদদ দিয়েছে।

নামে অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশিরভাগ নেতাই বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

আবার ভোটের রাজনীতিতে এসব দলের মধ্যে একপক্ষ বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং আরেকপক্ষ প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তাই অরাজনৈতিক পরিচয়ের হেফাজতে ইসলাম কোনও না কোনোভাবে রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে নয়।
আবার একটি বড় ধর্মীয় সংগঠন হওয়ায় তাদের কখনও ভালো আচরণ দিয়ে আবার কখনও জোর করে কাছে পাওয়ার চেষ্টা করে আসছে ক্ষমতাসীন দলগুলো।

মতবিরোধ থাকলেও হেফাজত নেতারা সব সময় বলে আসছেন—তারা যেহেতু অরাজনৈতিক, তাই রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে চূড়ান্ত বিরোধে যেতে চায় না তারা।
হয়তো এ কারণেই অনেক সময় সরকারের সঙ্গে সংঘাত হলেও আবার আলোচনার টেবিলেও বসেছে।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা ও ২০১৭ সালে মোদিবিরোধী আন্দোলনে সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের হত্যার অভিযোগ আনলেও ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর ‘শুকরিয়া সমাবেশে’ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছেন হেফাজতের তৎকালীন আমির প্রয়াত শাহ আহমদ শফি বা শফি হুজুর।
আবার ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের কয়েক দিন আগেও শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠক করেন হেফাজত নেতারা।
এই শফি হুজুরই কিন্তু চরমভাবে নারী বিদ্বেষী আবার চরমভাবে নারীলিপ্সু ছিলেন। তার চরম এক বিতর্কিত মন্তব্য নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। তিনি নারীদেরকে তেঁতুলের মত আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন তেঁতুল দেখলে যেমন মানুষের জিহ্বায় লালা পড়ে তেমনি নারীদেরকে দেখলেও পুরুষের নাকি লালা পড়ে!
কি চরম যৌনলিপ্সা ও নারী বিদ্বেষী ছিলেন এই হেফাজতের আমীর শফি আহমেদ , ভাবুনতো! তার হাতে গড়া এই হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশ এর নতুন হুজুররা আর কেমন হবে তাতো সহজেই অনুমান করা যায়।
কিন্তু আখেরে তারাই আবার ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে আওয়ামীলীগের বিপক্ষে রাজপথে নেমেছে সদলবলে। এমনকি ড. ইউনুসের অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে রাজপথে আন্দোলন করেছে তারা।
তাই তারেক রহমান তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ভবিষ্যতে কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন, সেটিও বিশ্লেষণ সাপেক্ষ।
একাত্তরের নরঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীদের বিকরুদ্ধে ২০১০ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের চরম বিরোধীতা করে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তির জানান দেয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
বিশেষ করে ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সারা দেশের নেতাকর্মীদের জড়ো করে তারা। তখন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। সে সময় নিজেদের বেশ কিছু নেতাকর্মীর হতাহতের কথাও জানান তারা। যদিও তার সত্যতা মেলেনি।
আবার ২০১৭ সালে মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে ঘিরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে কঠোর আন্দোলন করে হেফাজত।
এর বাইরেও ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়েও সরকারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। আর ধর্মীয় নানা ইস্যুতে প্রতি জুমার পরই তাদের কর্মসূচিতে উত্তপ্ত থাকতো বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরের বড় মসজিদগুলো ঘিরে।
এমন বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেই কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের মান দেওয়ার ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার।
এ উপলক্ষে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির প্রয়াত শাহ আহমদ শফী।

তবে তাদের সে মধুর সম্পর্কও বেশি দিন টিকেনি। শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতে দুটি ধারা তৈরি হয়। একটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরী এবং আরেকটি পক্ষ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীকে ঘিরে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
তখন আনাস মাদানীর পক্ষটি আওয়ামী সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখলেও জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষটি সরকারে বিপক্ষে অবস্থান নেয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত আনাস মাদানীর বলয়টি টিকেনি।
আর হেফাজতের বড় অংশটি কথিত জুলাই আন্দোলনে সরকার পতনের আন্দোলনে মাঠে সক্রিয় ছিল। এমনকি জুলাই পরবর্তী আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতেও তারা ভূমিকা রেখেছে।
আওয়ামীলীগ আমলে হেফাজতের তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী জামায়াতে ইসলামীকে মদিনার ইসলাম নয়, ‘মওদুদীর ইসলাম’ বলে আখ্যায়িত করেন। আবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাবেশে সংগঠনটির বর্তমান আমির মহিবুল্লাহ বাবুনগরীও একই ধরনের বক্তব্য রাখেন।
তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন— জামায়াত কোনও ইসলামী দল নয়। তাই তাদেরকে সমর্থন দেওয়া যাবে না। নির্বাচনের পরও তিনি এ সংক্রান্ত একাধিক বক্তব্য দেন। এমনকি জামায়াতের বিপক্ষে কওমি-ভিত্তিক দলগুলোকে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাদের নেতৃত্বে আলাদা জোট গড়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এর মধ্যেই কওমিপন্থি দলগুলোর সমন্বয়ে জোট গঠনের প্রক্রিয়াও চালাচ্ছেন তারা।
চট্টগ্রামে হেফাজতের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিএনপি’র অন্য মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে হেফাজতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবিদাওয়া দেওয়া হয়।
এর মধ্যে অন্যতম হলো-
বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে সংসদে আইন পাস, কুরআন-সুন্নাহ’র সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোন আইন পাস না করা এবং শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে মোদীবিরোধী আন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই-অগাস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ অন্যান্য দাবি।
সেইসঙ্গে, রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামি আলেমদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
একদিকে হেফাজতে ইসলামীর নেতারা দাবি করছেন তারা রাজনৈতিক সংগঠন নয়, কিন্তু তারা আবার রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের “ ইসলামী আলেম”দের অংশীদারিত্ব দাবি করেছেন। এটি কি রাজনীতি নয় ?
তবে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’র যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, “উনারা (বিএনপি) আলেমদের নিয়ে জোট করেছেন, ইলেকশন করেছেন। কিন্তু সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আলেমদের রাখা হয় নাই।
আমরা মনে করি, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সরকার পরিচালনায় আলেমদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি,”তাদের এই ৯ দফা দাবিগুলো শোনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল- জানতে চাইলে আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, “তিনি বলেছেন যে, আমি একজন মুসলমান এবং এটা মুসলিম রাষ্ট্র। কাজেই ইসলামবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড, কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড অতীতেও আমাদের সরকারের আমলে হয় নাই, ইনশাল্লাহ সেটা আমার সরকারের আমলেও হবে না।”
স্বাভাবিকভাবেই কৌতুহল জাগে- বিএনপি কি কৌশলে হেফাজতকে হ্যান্ডল করতে পারবে ? যদিও ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সেই আন্দোলনের সময় তাদেরকে নানাভাবে উসকে দিয়ে বিএনপি ও জামায়াত আওয়ামীলগের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্র করছিল।
কিন্তু তা সফল হয়নি আওয়ামীলীগের তৎকালীন বিচক্ষণ সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের সঠিক রাজনৈতিক পদক্ষেপের কারণে।
আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা একসময় প্রচন্ডভাবে আশা ও বিশ্বাস করতেন হেফাজতে ইসলামী তাঁকে ও তার দলকে ভোট দেবে, জামায়াতের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আওয়ামীলীগকে সমর্থন ও সহযোগিতা করবে।
কারণ তাঁকে চট্টগ্রামে রাঙ্গুনিয়ার সুবিধাবাদী আওয়ামী নেতা সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এমন ভুল তথ্য দিয়েই বিভ্রান্ত করেছিলেন।
কিন্তু শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই পরে হাছান মাহমুদের চালাকি ধরতে পেরেছেন বা নিজের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে যে চরম ভুল ছিল তাও হয়তো বুঝেছেন। কিন্তু ততদিনে সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি উল্টো ঘুরে গেছে।
তবে বিএনপি’র পক্ষে আবার অতটা কঠিন হবেনা সম্ভবত।

কারণ, বিএনপি আগাগোড়াই ইসলামী ঘরানা ও ভারত বিরোধী রাজনীতির বলয়ে চলেছে। তবে দেখার বিষয় আদৌ বিএনপিকে এখনকার হেফাজতে ইসলামী কতটুকু সাহায্য করে।
#রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
