একসময় যিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড রকমের সোচ্চার ছিলেন সেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বনে যাওয়া ডা. জাহেদ উর রহমান আবার সেই ভারতেই গিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ) সম্মেলনে যোগ দিতে।
যিনি গত চব্বিশের জুলাই-আগষ্টে কথিত গণ আন্দোলনে যে শ্লোগান উঠেছিল –হেই দিল্লী না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা -তার প্রচণ্ড সমর্থকই ছিলেন না শুধু লেখালেখি ও তার নিজের ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে, আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে প্রচন্ড রকমের বিষোদ্গার করতেও ছাড়েননি।
কিন্তু ভারতে কালো তালিকাভুক্ত সেই ডা. জাহেদই আবার বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হয়ে দিল্লী গিয়েছিলেন একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। কিন্তু আগের কৃতকর্মের জন্য সেখানে গিয়ে বিমানবন্দরে দায়িত্বরত ইমিগ্রেশন পুলিশের নানা প্রশ্নবানের সন্মুখীন হয়েছেন।
তবে দুই দেশের নানাবিধ দেন দরবারের পর ডা. জাহেদ উর রহমানকে সে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু তাতে ডাক্তার জাহেদের ইগোতে লাগে।
গোস্বার চোটে তিনি আর সম্মেলনে যোগ দিতে রাজি না হয়ে কলম্বো হয়ে সোমবার দুপুরে ঢাকায় ফিরেছেন। তবে সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে গেছেন। কারণটি কি তা এখনো জানানো হয়নি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত এই উপদেষ্টার পক্ষ থেকে।
তবে ভারতের দিল্লি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের বাধায় পড়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের দেশে ফিরে আসার ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ খলিলুর রহমান।

এই খলিলুর রহমানও কিন্তু বিগত জবরদখলকারি ড.ইউনুস সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ছিলেন মূলত আমেরিকান স্বার্থসিদ্ধির জন্য। তিনি আমেরিকার নাগরিকও বটে।
একজন বিদেশী নাগরিক কিভাবে বাংলাদেশের সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর পদে থাকেন সেটা রহস্যজনক। এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি কথিত ইলেকশনের নামে সিলেকশনে বিএনপি জেতার পর মি: খলিলকেই আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী করতে বাধ্য হন জনাব তারেক রহমান।
সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন “এটা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। দুঃখজনকও বটে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে। দিন শেষে আমরা এ বিষয়ে জানাবো,” পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন খলিলুর রহমান।
আচ্ছা সে না হয় উনি জানাবেন। মুখ রক্ষার খাতিরে কিছু একটাতো বলতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। হয়তো বাংলাদেশে ভারতের নিযুক্ত হাইকমিশনারকে ডেকেও কড়াভাবে কিছু বলতে পারে যদি সে সাহস বা যৌক্তিক কারণ থাকে।
কূটনৈতিক পর্যায়ে কি হবে না হবে সে দেখা যাবে। কিন্তু প্রশ্নতো অন্য জায়গায়। এই যে ডা.জাহেদ উর রহমান দিল্লী গেলেন তখন তিনি কি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিয়ে গিয়েছিলেন না সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে গিয়েছিলেন?
যতদূর জানা গেছে তিনি সাধারণ পাসপোর্টধারী ছিলেন। তো সেখানেতো ইমিগ্রেশন পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতেই পারে বিভিন্ন বিষয়ে। লাল পাসপোর্ট বহন করলে নিশ্চয়ই এমনসব কাণ্ড হতোনা।
আর যখন তাঁকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল তখন তিনি বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এবং দিল্লীতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান।
বিষয়টি দুই দেশের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের পর এই টকশো জাহেদ উর রহমান যিনি এখন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে রয়েছেন তাকে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ ভারতে ঢোকার অনুমতি দেয়।
কিন্তু কেন এমন একজন খ্যাতিমান (!) উপদেষ্টাকে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলো সেজন্য প্রচণ্ড ইগোতে লেগেছে আমাদের ‘জাহেদ টক’স এর ডা.জাহেদ সাহেবের।
কিন্তু জাহেদ উর রহমানের পাসপোর্ট ভারত সরকারের তালিকায় ‘ফ্ল্যাগড’ ছিল। বিবিসি’র সংবাদ অনুযায়ী যা জানা গেলো তা হলো- জাহেদ উর রহমানের এই পাসপোর্টটি ভারত সরকারের সতর্কতামূলক আপত্তি তালিকায় ছিল।
এর ফলে দিল্লি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাঁকে দিল্লি প্রবেশে বাধা দেন। তবে তাঁকে স্বাগত জানাতে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা বিমানবন্দরে ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে কেন্দ্র করে ভারত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ও বাংলাদেশে উচ্চ পর্যায়ে দফায় দফায় যোগাযোগ হয়।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষমাণ থাকা ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার পর মি. রহমান ভারতে প্রবেশ না করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন এবং কলম্বো হয়ে ১৫ জুন ঢাকায় ফিরে আসেন।
তবে এরই মধ্যে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারতকে এক্কেবারে ৫০৭ কাপড় কাচা সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা হচ্ছে।
কেউ কেউ পারলেতো এখুনি ভারতের সবকিছুই বন্ধ করে দেয়, এমনই মনোভাব আরকি। তবে এরই মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে যা জানলাম তা একটু গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে বলি অকারণে ভারত বিরোধীতাকারিদের।
তা হলো- প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার কাছে থাকার কথা কূটনৈতিক পাসপোর্ট। কিন্তু তার কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেই। ফলে তিনি কূটনৈতিক সফরে গেছেন না ব্যক্তিগত সফরে গেছেন তা বোঝা দিল্লি এয়ারপোর্টের জন্য সম্ভব হয়নি প্রথমে। পরে যখন তারা নিশ্চিত হয়েছেন তখন তাকে ইমিগ্রেশন পাস দিয়েছেন।

বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে দিল্লি এয়ারপোর্টকে কোন চিঠি দেওয়া হয়নি। ফলে ডা.জাহেদ সাহেবের এক্সট্রা খাতির আশা করাটা বোকামি হয়েছে।
চিঠি ছাড়া যে কারো যে কোন সফরই রেগুলার প্রোসেসে হবে এটাই নরমাল। আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত হচ্ছে যে, জনাব ডা.জাহেদ উর রহমান সাহেব ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ) সম্মেলনে বাংলাদেশ টীমের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। কিন্তু তার টীমের অন্য সদস্য কারা ছিলেন? কয় সদস্যের টীম ছিল, তারাইবা কোথায় সে সম্পর্কে কোন তথ্য নেই সংবাদ মাধ্যমগুলোতে।
জাহেদ সাহেবের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য তার ইউটিউব চ্যানেল আগে থেকেই ভারতে ব্যান করে রাখা। ফলে তিনি এয়ারপোর্টের লাল বা কালো তালিকায় থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।
ফলে এয়ারপোর্ট অথোরিটি যাচাই-বাছাই না করেই তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকতে দেবে না। এটা ভারতের নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ।
এই বিষয়গুলো যখন দিল্লী বিমানবন্দরের ইমগ্রেশন বিভাগ আমাদের প্রথম আলো’র কলামিস্ট ডা. জাহেদ উর রহমানকে একটু তল্লাশি করেছে, সওয়াল জবাব করেছে ওমনি তার ইগোতে লেগেছে।
তার ভাবখানা এমন– তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তার সাথে ভারত শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ করেছে এই মর্মে ভারতে আর না ঢুকে এখন নাকি দেশে ফিরে আসেন। তারমানে বয়কট দিল্লী !
এটি কি ডা. জাহেদের আগেভাগে প্ল্যান করা ছিল কিনা সেটিও ভেবে দেখা দরকার।
কারণ তিনিতো সে দেশেও প্রোটোকল পাওয়ার অধিকারি। কিন্তু সেজন্য লাল পাসপোর্ট দরকার ছিল।
দরকার ছিল সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশনের যোগাযোগ, এমনকি ইমিগ্রেশন বিভাগের সাথেও। কিন্তু যতদূর বুঝতে পেরেছি তা করা হয়নি। হয়তো দেখা যাবে সময় সুযোগ বুঝে এই প্রথম আলো গ্রুপের টকশো বুদ্ধিজীবী ডা. জাহেদ প্রেস ব্রিফিং করে নিজের মনের মাধুরি মিলিয়ে গল্প শোনাবেন আমাদের।
তবে এই ইস্যুটা মূলত জায়েদ সাহেবের রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল বিষয়ে অনভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশ হাই কমিশন দিল্লির অপেশাদারিত্ব। এখানে ভারতের দোষ খুবই সামান্য যা বুঝলাম।
কিন্তু ইস্যুটাকে বিএনপির এক্টিভিস্টরা ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রচার করছে যে, “জায়েদকে অসম্মান করার জন্য তিনি ফিরে আসছে। তার হ্যাডম আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।” এখানে হ্যাডমের কিছু নাই।
আপনি যদি বুঝতে পারেন যে এটা আপনার দেশের ফল্ট, দেশের প্রতিনিধি হিসেবে আপনার কাজ ইগো দেখানো না। ফল্টটা এড্রেস করে সমাধান করা। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অশোভন বা অসম্মানজনক আচরণের শিকার হননি।
বিএনপি সরকারের উচিত বর্তমান হাইকমিশনারের ভূমিকা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত বিবেচনা করা। এ ধরনের ঘটনা অপ্রয়োজনীয়ভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এবং যথাযথ স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিষয়টি মোকাবিলা না করা হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কূটনৈতিক পাসপোর্টের বদলে সাধারণ পাসপোর্ট বহন করা বা না করা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক সৈয়দ বোরহান কবীর বললেন- “একজন কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী ব্যক্তি সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ সফর করতে পারেন না। এটা অপরাধ। এজন্য আওয়ামীলীগ সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর চাকরি চলে গিয়েছিল।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। মাদারীপুরের জনপ্রিয় নেতা সৈয়দ আবুল হোসেনকে করা হয়েছিল স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্টের বদলে সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে সিংগাপুর যান।
এনিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট হলে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন এটা তার ব্যক্তিগত সফর, সরকারি সফর নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইন পর্যালোচনা করে দেখেন কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী কোন কারণেই সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ ভ্রমণ করতে পারেন না।
প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন কে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। এটা ছিল একটি দৃষ্টান্ত।
বর্তমান বিএনপি সরকারের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সরকারি সফরে দিল্লি গিয়ে বিব্রত পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। গনমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্টের বদলে সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। এজন্যই তাকে আটকে দেয়া হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যমের এই খবর যদি সত্যি হয় তাহলে জাহেদ পাসপোর্ট বিধিই শুধু লংঘন করেননি, আইন আমান্যও করেছেন।এক্ষেত্রে তার পদত্যাগ করা উচিত। কিংবা প্রধানমন্ত্রীর উচিত তাকে সরিয়ে দেয়া। জাহেদ কি পদত্যাগ করার সাহস রাখেন” ?
তো এখন সংসদে ও সংসদের বাইরে কি বিএনপি ও ইসলামী দলগুলো যারা কথায় কথায় ভারতের বিরোধীতা না করলে শান্তি পান না তারা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে দিল্লীকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়াতে পারবেন?
নাকি সেভেন সিস্টার্স দখল আর চিকেন নেকের
গলা চিপে ধরতে দৌঁড়াবেন ভারতের দিকে? কোনটি সুবিধে হয় দেখেন ভাই আপনারা।
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
