Oplus_131072

‘নুন আনতেই পান্তা ফুরায়’- এমন একটি বাংলা প্রবাদ আছে। আবার আমাদের নোয়াখালী অঞ্চলের বাসিন্দারা এমনও বলে থাকেন- ‘পোঁন্দদ নাই ত্যাঁনা ,মিডা দি ভাত খা না’। প্রায় কাছাকাছি হলেও এ দুটি প্রবাদের মধ্যে পার্থক্য আছে।

তবে এ দুটি প্রবাদবাক্যই আমাদের দেশের এখনকার পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য। কারণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যয়ে নাভিঃশ্বাস উঠেছে।

তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের প্রচণ্ড সংকটে দেশের সবকিছুই যেন স্থবির হয়ে পড়ছে। অপরদিকে একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি জামায়াতে ইসলামীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারি সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান অতি সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন- ‘আমদানী করা অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করা যায়না’।

অর্থাৎ এবার তিনি ও তার সহযোগীরা (রাজনৈতিক-সামরিক) যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদ বানিয়ে যুদ্ধ করতে নামবেন। এমনটাই ধারণা বা হুমকি দিলেন! তা দেশের মানুষ না খেয়ে মরুক, বিনা চিকিৎসায় মারা যাক, শিশু অকালে ঝড়ে পড়ুক হাম আর ডেঙ্গুতে- তাতে তাদের কি আসে যায়?

মানুষের দুঃখ-দুর্দশা-হামে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় হাজারখানেক নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুতে এদের হৃদয়ে কোন রেখাপাত করেনা। এদের চিন্তা হচ্ছে অস্ত্র-গোলাবারুদ আর যুদ্ধ। আর তার মূল টার্গেট হলো প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারত।

কারণ এ ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক ইস্যু নেই। কারণ এখনতো একটি ইসলামিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র। সুতরাং যুদ্ধ এবং যুদ্ধের মধ্য দিয়েই নিজেদের ইমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চায় এই জঙ্গী গোষ্ঠীটি। আর সেজন্যই অস্ত্রকারখানা-যুদ্ধে জেতার স্বপ্ন-বিদেশে অস্ত্র রপ্তানীর খোয়াব। তাও আবার দিবা খোয়াব !!

ওই যে নোয়াখালী অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক প্রবাদের বিষয়ে বলছিলাম লেখার শুরুতেই। তা বাংলায় দাঁড়ায় – পশ্চাৎদেশে কাপড় নেই পরনে কিন্তু মিঠা দিয়ে ভাত খাওয়ার শখ হয়েছে! আসলে বাংলাদেশের এখনকার অবস্থা হয়েছে ঠিক তাই।

পরনের কাপড় না থাকলেও কারো কারো যেমন মিঠা দিয়ে ভাত খাওয়ার উগ্র বাসনা জন্ম নেয়, তেমনি বাংলাদেশের সাবেক অবৈধ ক্ষমতাধারী ইউনুস সরকারও সেই উদগ্র বাসনায় নিজেদের ইচ্ছাপূরণের চেষ্টা করেছে। সেটি মূলত ছিল ভারতকে শাসানোর জন্য।

তখন কিন্তু সেই অবৈধ-অনির্বাচিত-উড়ে এসে জুড়ে বসা সুদখোর মহাজন ড. ইউনূসের আস্কারা ও প্রেট্রোনাইজেই ইসলামী ছাত্র শিবির-এনসিপি ও সামরিক অফিসার তুরস্কে সামরিক কারখানা দেখতে গিয়েছিলেন।

ইউনুসের আমলে বিনিয়োগ বোর্ডের সেই সিঙ্গাপুর থেকে আসা আশিক চৌধুরীসহ আরো কয়েকজনের একটি টীম তুরস্কের সামরিক কারখানা ও ঘাঁটিতে ঘুরে এসেছিলেন। আর বাংলাদেশ থেকে সামরিক উচ্চপদস্থ অফিসাররাতো গেছেনই কয়েকবার তুরস্কে।

খায়েশ আধুনিক ড্রোনসহ অন্যান্য সামরিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরীর জন্য সব ব্যবস্থা করা।

তো এখনকার তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও কিন্তু সেই সুদখোর ও দেশদ্রোহী ইউনুসের পথেই হাঁটছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে নিয়োগকৃত সেনাপ্রধান যিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চরম বেইমানি করে জামায়াতকে হাতে রেখে মার্কিন ডিপস্টেটের পরিকল্পনা অনুযায়ী আওয়ামীলীগকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন।

এমনকি তার নিয়োগকর্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রাণনাশের ষড়যন্ত্রও করেছিলেন। যদিও সৌভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনাকে সামরিক বাহিনীরই একটি উচ্চপদস্থ অংশ বিমান বাহিনীর বিমানে করে সসম্মানে দিল্লিতে রেখে এসেছিলেন নিরাপদে।

সেই ‘জামায়াতী ব্যাকড’ সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের অনেকদিনের খায়েশ ছিল বাংলাদেশকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রে পরিণত করার।

আর সেজন্য তিনি ও তার বশংবদ সেনা অফিসারদের পাকিপন্থী একটি উগ্রবাদী অংশ নানা ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে অনেকদিন থেকে।

তাদেরই খায়েশ অনুযায়ী তুরষ্কের এরদোগান সরকারের সঙ্গে গভীর পেয়ার মহব্বত গড়ে তোলার একটি গোপন-প্রকাশ্য সেতুবন্ধন তৈরী করে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী অংশ।

আর তাদের এই রাজনৈতিক-সামরিক অভিলাসের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি ইসলামী উগ্রবাদী দল, অবসরপ্রাপ্ত বেশ কিছু উগ্র সেনা অফিসারও এই কাজের সঙ্গে জড়িত।

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে পাক-গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যেমন সক্রিয় তেমনি তুরস্কের সেনা গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে।

শুধু তাই নয় তুরস্ক বেশ কয়েকবছর যাবৎ ইসলামী উম্মারহর ছদ্মাবরণে বেশ কয়েকটি এনজিওকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজে লাগাচ্ছে। তবে তাদের বেশি কাজ হচ্ছে কক্সবাজার-টেকনাফ ও বান্দরবান এলাকাতে।

এসব এনজিও মূলত সাহায্যের নামে সেইসব এলাকার উগ্রবাদী মুসলিম নাগরিক ও রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে নানাভাবে প্ররোচিত করে যাচ্ছে। আর নানা কৌশলে সামরিক প্রশিক্ষণও দিয়ে যাচ্ছে এই সাহায্য সংস্থার আড়ালে।

প্রসঙ্গত ২০২৬ সালের জুন মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকা সফর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

এ সময় দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) এবং বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী তুরস্কের প্রযুক্তি সহায়তায় ড্রোন, সামরিক যান ও গোলাবারুদ দেশে যৌথভাবে উৎপাদনের (Joint Production) বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে এই সংক্রান্ত শিল্প স্থাপনের কাজ অনেকদূর এগিয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

আর এজন্য ‘ আমদানী করা অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করা যায়না ‘- সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান এমন মন্তব্য করে বাহবা কুড়াচ্ছেন বাংলাদেশের একশ্রেণীর উগ্রবাদী মুসলমানদের কাছ থেকে।

কিন্তু যুদ্ধ করবে কার সঙ্গে? মিয়ানমারের সঙ্গে কখনো কোন বিষয়ে বাংলাদেশ যুদ্ধ করেনি, মিয়ানমার শত উস্কানি ও বাংলাদেশি নাগরিক মারলেও। এমনকি মিয়ানমারের মর্টার শেল ও গোরঅগুলি বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে হলেও। কারণ মিয়ানমারকে বাংলাদেশ শত্রু মনে করেনা।

কারণ জানে যে মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ করলে তাদের সেই ১৯৭১ সালের পাক মিত্র চীন প্রচণ্ড নাখোশ হবে।

তাই মিয়ানমার যতই বাংলাদেশকে ঠেলুক, মানুষ মারুক, মর্টার শেল ছুড়ুক তাতে বেশ আমোদই লাগে বাংলাদেশের। আর লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বিশেষ করে ইসলামী জঙ্গী রোহিঙ্গাদের বেশ কদর এখনকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে। অবশ্য ইউনুসীয় সরকারের কাছেও অনেক বেশি কদর ছিল তাদের। আসলে ইউনুস সরকারেরই তো ধারাবাহিক সরকার এখনকার তারেক রহমানের সরকার।

আমদানি করা অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়—বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এই মন্তব্যটি করেছেন চট্টগ্রামে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক অস্ত্র কারখানা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জমি হস্তান্তর সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে।

চট্টগ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের পাশে অবস্থিত সাবেক জলিল টেক্সটাইল মিলসের ৫৫ একর জমি বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানাকে (BOF) হস্তান্তরের এই অনুষ্ঠানে দেশের প্রতিরক্ষা খাতকে স্বাবলম্বী করা এবং সমরাস্ত্র রপ্তানিমুখী করার এক আকাশ-কুসুম স্বপ্নে এই জামায়াতী সেনা প্রধান ওয়াকার তার খায়েশের কথাটি প্রকাশ্যে বলেলেন।

তবে এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জনমনে এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ আসলে কার সাথে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে? ভারতের সাথে কি কোনো নতুন সামরিক সংঘাতের ইঙ্গিত এটি?

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে ( ভারত) কেন্দ্র করে নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আধুনিক যুদ্ধকৌশলে দেখা গেছে, যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংকটে যদি কোনো দেশ সম্পূর্ণরূপে বিদেশী অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে যুদ্ধের সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) ব্যাহত হলে জাতীয় নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ে।

উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের পশ্চিমা অস্ত্রের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা এবং সরবরাহে সামান্য বিলম্ব কীভাবে তাদের ফ্রন্টলাইনকে দুর্বল করেছে, তা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে- এমন যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশের মূল সমস্যাসমুহ সমাধান করার পরিবর্তে অস্ত্র বানানো , যুদ্ধ করা ও বিদেশে অস্ত্র-গোরঅবারুদ রপ্তানী করার খোয়াব দেখানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিকে (BOF) প্রসারিত করে নিজস্ব ড্রোন, সাইবার সিস্টেম এবং গোলাবারুদ তৈরির জন্য এমনটি উঠেপড়ে লেগেছেন ওয়াকার উজ-জামান।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত ১৯ থেকে ২৫ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত তুরস্কে ৫ দিনের একটি সরকারি সফর সম্পন্ন করেন। এই সফরে তিনি তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রযুক্তি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ—যেমন ASISGUARD, Turkish Aerospace Industries (TUSAS), MKE (Makine ve Kimya Endüstrisi), SARSILMAZ, STM, ROKETSAN, ASELSAN এবং BAYKAR পরিদর্শন করেন।

এছাড়া বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ASELSAN পরিদর্শন করেন।

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর এই উচ্চপর্যায়ের সমরাস্ত্র কারখানা পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্যগুলো ছিল- প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ অংশীদারিত্ব (Joint Collaboration): বাংলাদেশে তুরস্কের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় নতুন হাইটেক সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ কারখানা স্থাপন করা (যেমন চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে সামরিক কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা)।

সামরিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তুরস্কের আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং উদ্ভাবনগুলো সরাসরি দেখা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়:

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তুরস্ক থেকে আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন Hisar-O মাঝারি পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা), ড্রোন ও ক্ষুদ্রাস্ত্র ক্রয়ের বিষয়টি ত্বরান্বিত করা।

এর মধ্য দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সম্পর্ক জোরদার করার একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। — এমন ভাষ্যও দেয়া হচ্ছে সামরিক কারখানা তৈরীর পক্ষে।

সেনাপ্রধানের যুদ্ধের কথা বলার সাথে সাথেই দেশের আপামর জনসাধারণের মনে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশের সম্ভাব্য শত্রু কে?

বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানা মূলত ভারত এবং মিয়ানমার—এই দুটি দেশের সাথে যুক্ত। এছাড়া বাকি অংশ বঙ্গোপসাগর। ফলে যেকোনো স্থল কিংবা বিমান আক্রমণের শঙ্কা এই দুই প্রতিবেশীর কাছ থেকেই আসতে পারে।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি কখনো সম্পূর্ণ শান্ত ছিল না। ২০১৭ সালে কমপক্ষে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশ-ইন করার ঘটনাকে বিশ্লেষকরা এক ধরণের “জনসংখ্যাগত আগ্রাসন” বা ‘Demographic Aggression’ হিসেবে দেখেন। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং আরাকান আর্মির (Arakan Army) সাথে সংঘাতের জেরে একাধিকবার বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে গোলা নিক্ষেপ করেছে।

অসংখ্যবার মিয়ানমারে যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। সাম্প্রতিক সময়েও সেনাপ্রধান রোহিঙ্গা সংকটকে দেশের অর্থনীতি এবং পরিবেশের জন্য এক বিশাল নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ফলে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী কিংবা অন্য কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী যদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, তবে সেখানে একটি সীমিত আকারের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাকে কখনো উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে মিয়ানমার নয়। মূলত বাংলাদেশে আওয়ামীরীগ ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দলই ভারতকে তাদের শত্রুরাষ্ট্র মনে করে। যে কোন উছিলায় ভারতকে গালি ও কথায় কথায় ভারত দখল, ভারতের সেভেন সিস্টার্স দখল করে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে, এখনো হচ্ছে।

তাই ওয়াকারের বক্তব্য অনুযায়ী মূলত ভারতই ফ্যাক্টর জামায়াত, বিএনপিসহ সেনাবাহিনীর কাছে। আর সেনা অভ্যন্তরে চরম হিন্দুবিদ্বেষ ও ভারত বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অবশ্য সে প্রতক্রয়াটি অনেক আগে থেকেই চলছিল। এখন তা আরো অনেক বেশি করে চর্চা হচ্ছে।

অনেকের প্রশ্ন– সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যটি হুমকি নাকি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা চাপ তৈরী করার একটি প্রক্রিয়া? প্রশ্নোত্তরে যে বড় সংশয়টি প্রকাশ পেয়েছে—”ভারতের সাথেই কি তবে নতুন করে যুদ্ধ করার হুমকি দিলেন সেনাপ্রধান?”—এর উত্তরটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং একই সাথে অত্যন্ত জটিল।

৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি দৃশ্যমান শীতলতা লক্ষ্য করা গেছে। ইউনুসের আমল থেকেই প্রচণ্ড ভারত বিরোধিতা উস্কে দেয়া হয়েছে। যা এখনো চলমান।

এই কঠিন বাস্তবতায় বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার যখন “যুদ্ধের জন্য নিজস্ব অস্ত্রের সক্ষমতা” বাড়ানোর কথা বলেন, তখন দেশের ভেতরের একটি বড় অংশ একে ভারতের বিরুদ্ধে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বা সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে পছন্দ করে।

তবে একে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি “যুদ্ধের হুমকি” হিসেবে দেখা সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে চরম ভুল হবে। ভারত পারমাণবিক শক্তিধর এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক পরাশক্তি।

বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং রাজস্ব ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে নতুন সামরিক অর্থনৈতিক জোন ও প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো খাতের বাজেট যখন সংকুচিত, তখন সামরিক খাতে এত বড় বিনিয়োগ দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে যে বিঘ্নিত করবে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।

রপ্তানির অসম্ভাব্যতা ও বাজারজাতকরণের খোয়াব দেখছেন সেনাপ্রধান। তিনি সমরাস্ত্র রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কথা বলেছেন।

কিন্তু আন্তর্জাতিক অস্ত্রের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং এমনকি আঞ্চলিক প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান সমরাস্ত্র বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ কোন ধরণের প্রযুক্তির অস্ত্র রপ্তানি করবে এবং এর ক্রেতা কারা হবে, তা একটি বড় প্রশ্ন।

চরম অর্থনৈতিক সংকট বনাম সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মূলত পাকিস্তান মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে। তাদের মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের সময়ে সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির কথা বলা বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। অনেকে একে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে তুলনা করেন।

কারণ পাকিস্তানে দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের চেয়ে প্রতিরক্ষা খাতকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।

পেটে খাবার বা নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ না দিয়ে সামরিক খাতে বড় স্বপ্নের কথা বলা অনেকের কাছেই “স্বপ্নবিলাস” বলে মনে হতে পারে।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের এই বক্তব্যকে একদল মানুষ দেশের বর্তমান চরম অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে একটি অপ্রাসঙ্গিক ও উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন হিসেবে দেখছেন।

তবে এর ভেতরে মূল বিষয় হলো- ভারত আর হিন্দু বিরোধীতা। তুরস্কও উস্কাচ্ছে বাংলাদেশকে। অপরিদিকে পাকিস্তানতো রয়েছেই। আবার মার্কিনীরাও নানা খেলা খেলছে।

কারণ বাংলাদেশ যদি ড্রোনসহ অন্য সামরিক অস্ত্রে শক্তিশালি হতে পারে তাহলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদি শক্তিগুলোকে এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে সেভেন সিস্টার্স অশান্ত রাখার চিন্তা করছে পাক-তুরষ্ক-বাংলাদেশ ও আমেরিকা।

এমনকি চীনও সেক্ষেত্রে অপ্রকাশ্যে ইন্ধন যোগাচ্ছে। অপরদিকে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে পাক-সেনাবাহিনী ও ইসলামী জঙ্গিরা ভারতকে অশান্ত করার ষড়যন্ত্র করছে। আর সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হচ্ছে বাংলাদেশ আর এর জামায়াত ও ইসলামী জঙ্গী মতাদর্শের সশস্ত্র বাহিনী।

কিন্তু বাংলাদেশ যদি এমন বোকামি করে তাহলে এর জন্য চরম মাশুল দিতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো- তারেক রহমানের সরকার কি সেই মাশুল দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত?

# ইশরাত জাহান: লেখক, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার কর্মী।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *