ঢাকা: ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ শেখ হাসিনা। সে কথা প্রকাশ্যে বললেন তিনি। এর আগেও বলেছেন। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
ভারতের জন্যই তিনি আশ্রয় পেয়েছেন। তাঁকে সম্মানের সঙ্গে রাখা হয়েছে সেখানে। বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার পর প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে বললেন শেখ হাসিনা।
তাঁর কথায়, ‘আমরা যখনই বিপদে পড়েছি, ভারত আমাদের পাশে থেকেছে। কোনও সময় সাহায্য করা থেকে পিছু হটেনি।’
বাংলাদেশে তিনি ফিরবেন। মানুষের জন্য তাঁকে ফিরতে হবে।
বুধবার সাংবাদিক বৈঠক থেকে ফের পরিষ্কার করে দেন হাসিনা।
হাসিনার দাবি, ক্ষমতায় ফেরার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বাংলাদেশে ফিরছেন না। তাঁর লক্ষ্য নিজের দেশকে ‘সঠিক পথে’ ফেরানো।
তিনি বাংলাদেশে ফিরলে তাঁকে মেরে ফেলা হতে পারে, সেই আশঙ্কা রয়েছে। এই সবের তোয়াক্কা না করেই বাংলাদেশে ফিরতে চান আওয়ামী লীগ নেত্রী।
গত দু’বছরে (অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিএনপি সরকারের আমলে) বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শুধু পিছিয়েই পড়েছে বলে অভিযোগ হাসিনার।
নিজের দেশকে এই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের জন্যই বাংলাদেশে ফিরতে চান তিনি।
তাঁর দেশে ফেরা উচিৎ এমনটা আগেই মন্তব্য করেছেন লেখক তসলিমা নাসরিন। এবার আবারো শেখ হাসিনার বার্তার সমর্থন করলেন। তিনি যা লিখেছেন তা হুবহু তুলে ধরলাম:
“আজ দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভাষণ শুনলাম। দু’ বছর দেশ থেকে দূরে থেকেও তাঁর কণ্ঠে ভাঙন ছিল না; ছিল দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্প। বত্রিশ বছর ধরে নির্বাসিত একজন মানুষ হিসেবে নিজের দেশে ফেরার এই আকুলতা আমি বুঝি। তাঁর দৃঢ়তা আমাকে স্পর্শ করেছে।
শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এই নির্দেশ অগণতান্ত্রিক। ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, বিরোধী কণ্ঠ নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্র নয়। শেখ হাসিনার কথা বলার, আত্মপক্ষ সমর্থন করার এবং নিজের দেশে ফেরার পূর্ণ অধিকার আছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা উচিত। দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সরকার বা আদালত নয়, জনগণই ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করুক।
তবে শেখ হাসিনাকেও একটি কথা বলতে চাই। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার করা হয়েছিল, তিনি তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
সেই ঘটনার পূর্ণ সত্য অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া দরকার। কিন্তু এত মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের জন্য তাঁর সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়ের প্রশ্নটিও তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না। শুধু ষড়যন্ত্রের কথা বললে ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং একজন নেতার সবচেয়ে বড় সাহস।
শেখ হাসিনার আরও একটি বড় রাজনৈতিক ভুলের কথাও তাঁকে স্বীকার করতে হবে। ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে তিনি বারবার ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস করেছেন।
হেফাজতের দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল ও অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দিয়েছেন, কওমি মাদ্রাসার সনদকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, আর ইসলামি জঙ্গিদের হাতে একের পর এক মুক্তচিন্তক খুন হওয়ার সময় নিহতদের পাশে নিঃশর্তভাবে দাঁড়ানোর বদলে লেখকদেরই ধর্মের সমালোচনা না করার উপদেশ দিয়েছেন।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস—ক্ষমতা রক্ষার জন্য যে ধর্মান্ধ জিহাদি অপশক্তিকে তিনি বছরের পর বছর তুষ্ট ও প্রশ্রয় দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই ছাত্রদের আন্দোলনে ঢুকে আন্দোলনটিকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে তাঁর পতন ঘটিয়েছে। তিনি শুধু ষড়যন্ত্রের শিকার নন; ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে তাঁর ধারাবাহিক আপসই সেই ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার জমি তৈরি করেছিল।
আজকের বিপর্যয়ের সম্পূর্ণ দায় তাঁর একার নয়; কিন্তু এই দায় থেকে তিনি মুক্তও নন। ধর্মান্ধ শক্তিকে তুষ্ট করে সাময়িকভাবে ক্ষমতা রক্ষা করা যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই ক্ষমতাকে গ্রাস করে—বাংলাদেশে ঠিক সেটিই ঘটেছে।
আমি চাই শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন—হত্যা, ফাঁসি বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার জন্য নয়; স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচারের নিশ্চয়তা নিয়ে।
তাঁর শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের যেমন বিচার হতে হবে, তেমনি তাঁর পতনের পর সংঘটিত হত্যা, লুটপাট, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারীর ওপর নিপীড়ন, সাংবাদিক ও মুক্তচিন্তকের কণ্ঠরোধ এবং ইসলামি মৌলবাদী সহিংসতারও বিচার হতে হবে। ন্যায়বিচার বেছে বেছে করা যায় না।
বাংলাদেশকে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শেখ হাসিনা ফিরুন—কিন্তু শুধু ক্ষমতার দাবিদার হয়ে নয়; নিজের শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটোরই সত্য স্বীকার করতে প্রস্তুত একজন নেতা হয়ে।
তিনি যদি সত্যিই নতুন করে শুরু করতে চান, তবে তাঁর ভয়াবহ রাজনৈতিক ভুলগুলো স্বীকার করে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আর কখনও আপস করবেন না—এই অঙ্গীকার তাঁকে করতে হবে। তাহলেই তাঁর ফেরা শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন হবে না; বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পুনর্জাগরণের একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে”।
