ঢাকা: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত জঙ্গী আন্দোলন চলাকালীন নিহতের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যকে ‘অত্যন্ত ভুল’ বলে চ্যালেঞ্জ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই সংখ্যা নিয়ে আগেই কথা উঠেছে। নিহতের সংখ্যা বেশি দেখিয়ে জনগণকে উত্তেজিত রাখা হয়েছে। আন্দোলনে সেনা-পুলিশের গুলিতে নিহতের সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জিত রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ আগেই উঠেছিল রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বিরুদ্ধে।
প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে প্রকৃত সংখ্যা জানিয়ে সংশোধনী প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
এবং নিকট অতীতে রাষ্ট্রসংঘকে এই ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি বলে ওয়াকিবহাল মহলের খবর।
হাসিনার তরফে লন্ডনের আইনি সংস্থাটি রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান ভলকার তুর্ককে লেখা চিঠিতে বলেছে, ২০২৪ এর জুলাই অগস্টের আন্দোলনের সময় ওই সংস্থার ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্টে নিহতের যে সংখ্যা বলা হয়েছে তা একদমই অতিরঞ্জিত এবং ভিত্তিহীন ও প্রমাণ বিহীন।
হাসিনার তরফে ভলকার তুর্ককে বলা হয়েছে, তিনি যেন সংস্থার রিপোর্টটি নিয়ে একটি সংশোধনী প্রকাশ করেন।
লন্ডনের আইনি সংস্থাটি ভলকার তুর্ককে লিখেছে, আমি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লিগের সভাপতি শেখ হাসিনার আইনজীবী হিসেবে আপনার দপ্তর থেকে প্রকাশিত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে “Human Rights Violations and Abuses related to the Protests of July and August 2024 in Bangladesh” শীর্ষক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
এটা এখন সর্বজনবিদিত; শেখ হাসিনার সরকারকে সহিংসভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করতে মিথ্যা ও উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানো হয়েছিল। এমনকী যা অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব সরকারি নথিতেও উল্লেখিত। সেই প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতকৃত রিপোর্টে জুলাই-অগস্ট ২০২৪ সময়ে ১,৪০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তা গুরুতরভাবে ভুল ও অতিরঞ্জিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত সরকারি গেজেট অনুযায়ী প্রকৃত নিহতের সংখ্যা জাতিসংঘের রিপোর্টে উল্লেখিত সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। আরও কিছু নিরপেক্ষ সূত্রে এই সংখ্যা আরও কম বলা হয়েছে।
এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে জাতিসংঘের একটি রিপোর্ট বাস্তবতার সঙ্গে এত বড় অমিল রেখে এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এর ফলে ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং বা প্রকৃত সত্য উদঘাটন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতাকে বৈধতা দিতে ভুল তথ্য ব্যবহারের একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হয়।
তাই বিনীতভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে, আপনার দপ্তর এ বিষয়ে একটি সংশোধনী প্রকাশ করে এবং ভুল তথ্য প্রত্যাহার করে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে।
চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে আন্দোলনে ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা বিভ্রান্তিকর।
সেখানে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারির গেজেট অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৮৩৪ জন, যা জাতিসংঘের প্রতিবেদনের প্রায় অর্ধেক। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি নিজস্ব হিসাবেও ৬৫০ জন নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তবে এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও দাবি করা হয়, জাতিসংঘের তদন্ত প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ছিল না, কারণ এটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে তদন্তের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এছাড়া চিঠিতে ড. ইউনূসের একটি পুরোনো মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি আন্দোলনকে ‘সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল অপারেশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন বলে দাবি করা হয়। আইনজীবীদের মতে, এই ধরনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিচালিত তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাউলস কেসি ও তার চেম্বার বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং জাতিসংঘে আগেও আবেদন করেছেন। এসব আবেদন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়, তবে দেশে তা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার আইনি দল জাতিসংঘকে আহ্বান জানিয়েছে তারা যেন এই তথ্য পুনর্বিবেচনা করে একটি প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দেয়।
তাদের দাবি, ভুল তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা একটি পক্ষপাতমূলক বর্ণনা তৈরি করতে পারে।
এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এই চিঠির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
