ঢাকা: বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ মারা গিয়েছেন। শূন্য হয়ে গেছে একটা বিশাল জায়গা।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন, পক্ষাঘাতে ভুগছিলেন এবং কার্যত জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বিদায় নিলেন; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ হিসেবে।

তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর।

তিনি অনেক কথাই লিখেছেন তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে:

“তোফায়েল আহমেদ: আমার সাংবাদিকতা জীবনের দুই স্মৃতি

তোফায়েল আহমেদকে আমি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সবচেয়ে বিচক্ষণ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে দেখেছি। অনর্গল বক্তৃতা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাস্তব ধারণা এবং তথ্য পরিবেশনে তার দক্ষতা সত্যিই অতুলনীয়। তাকে নিয়ে করা আমার দুটি স্মরণীয় রিপোর্টের কথা আজ খুব মনে পড়ছে।

প্রথম স্মৃতি: এক ভীতিকর পরিস্থিতির গল্প
প্রথম রিপোর্টটি ছিল তার নির্বাচনী এলাকায় (ভোলা) বিএনপি, ছাত্রদল ও অন্যান্যদের ওপর তার বাহিনীর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নিয়ে। ১৯৯৭ সালের সেই রিপোর্টটি শুরু হয়েছিল নিহত ভোলা জেলা ছাত্রদল সভাপতির মায়ের কান্না দিয়ে।

আমি নিজে ভোলায় সরেজমিনে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্টটি করেছিলাম।

পত্রিকার প্রথম পাতার ‘আপার ফোল্ডে’ চার কলাম জুড়ে, ভোলার ছবিসহ বড় হেডলাইন হয়েছিল: ‘ভোলার জনগণ অসহায় প্রশাসনের কাছে, প্রশাসন অসহায় মন্ত্রীর কাছে।’

তখন তিনি সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী। রিপোর্টটি প্রকাশের পর আমার তৎকালীন পত্রিকা ‘আজকের কাগজ’-এর ওপর চরম চাপ আসে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, তোফায়েল আহমেদ রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।

বাধ্য হয়ে সম্পাদকের নির্দেশে ওই দিনই ঢাকা থেকে আরেকজন রিপোর্টারকে ভোলায় পাঠানো হয় আমার রিপোর্টের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য।

আমার সেই সহকর্মী একসময় ছাত্রলীগ করতেন। কিন্তু তিনি ভোলা থেকে ফিরে সততার সাথে আমার পক্ষেই রিপোর্ট দেন এবং বলেন, “আনিস ভাই যা লিখেছেন, পরিস্থিতি আসলে তার চেয়েও খারাপ।” সে যাত্রায় আমার চাকরিটা রক্ষা পেয়েছিল।
এরপর আমার সাহসী সম্পাদক, মরহুম কাজী শাহেদ আহমেদ তোফায়েল আহমেদকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।

চিঠিতে তিনি বলেন, “আপনি অমুক দিন ওই রিপোর্টের জন্য আমাকে গালি দিয়েছিলেন। আনিস আলমগীরের রিপোর্টে কী অসত্য আছে, তা আপনাকে আগামী সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হলো।”

আজকের বাংলাদেশে এই রকম মেরুদণ্ডসম্পন্ন সম্পাদক কি আর একজনও জীবিত আছেন?

যাক, তোফায়েল ভাই সেই চিঠির কোনো জবাব দেননি। তবে আমার সম্পর্কে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নিয়েছিলেন এবং নেতিবাচক কিছুই পাননি”।

আনিস সাহেব আরো লেখেন, “আমার ওই রিপোর্টটি কিন্তু ভোলাবাসী মূল পত্রিকায় পড়তে পারেননি; কারণ পত্রিকা ভোলায় পৌঁছানোর আগেই তা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। পরে সাধারণ মানুষ সেটির ফটোকপি কিনে পড়েছিলেন।

তবে আমার সেই রিপোর্টটি হুবহু রিপ্রিন্ট করেছিল ‘সাপ্তাহিক সুগন্ধা’ পত্রিকা। ভোলাতে সেটি ব্যাপক বিক্রি হয়েছিল। অবশ্য এর মাশুল হিসেবে ওই পত্রিকার সম্পাদক আলম রায়হানকে পরবর্তীতে ৬ মাস ডিটেনশনে (আটকে) থাকতে হয়েছিল এবং পত্রিকাটির আয়ু সেখানেই শেষ হয়ে যায়।

তখনকার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল, তা নিশ্চয়ই এখন অনুমান করা যায়। আর আমার ওপরে ছায়া হয়ে কাজী শাহেদ আহমেদ কিভাবে ছিলেন সেটাও বুঝতে পারেন”।

আনিস আলমগীরের দ্বিতীয় স্মৃতি।

এক ইতিবাচক তোফায়েল আহমেদ
এবার তোফায়েল ভাই সম্পর্কে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা শোনাই।

পূর্বের ওই ঘটনার কিছুদিন পর আমি আরেকটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করি- ‘জামদানি জালিয়াতি’ শিরোনামে। অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির ওপর সরকারের ইনসেন্টিভ (প্রণোদনা) সুবিধা থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভারতে জামদানি রপ্তানির নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল।

রিপোর্টটি প্রকাশের পরপরই তোফায়েল ভাই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন। তিনি ওই দিনই নতুন পরিপত্র জারি করে জামদানির ওপর সেই ইনসেন্টিভ সুবিধা নিষিদ্ধ করেন।
বাংলাদেশ এর পর আর এমন তড়িৎকর্মা বাণিজ্যমন্ত্রী দেখেনি। যার আমলে জিনিসপত্রের দাম অসাধারণভাবে স্থিতিশীল ছিল এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায় অনিয়ম করতে যাকে রীতিমতো ভয় পেত”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *