ঢাকা: কবে ফিরবেন সেটা বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা! বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমনটাই বলেছেন এক সাক্ষাৎকারে।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “দেশে ফিরে আসার বিষয়টি কোনও নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়ের ওপর নির্ভর করে না। আমরা বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এটা কেবল আমার ফিরে আসার জন্যই জরুরি নয়, বরং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যও অপরিহার্য।”
তিনি দেশে নেই, তারমানে এই নয় যে তিনি নীরব। একথা মনে করিয়ে দিলেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘…তবে আমি একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই। আমার অনুপস্থিতির অর্থ আমার নীরবতা নয়। আমি প্রতিটি মুহূর্তে দেশের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি’।
ভারত থেকে তাঁর দেশে ফেরার এই প্রসঙ্গ নিয়ে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশি লেখক তসলিমা নাসরিন। বাংলাদেশি জন্মগত, তবে তিনি নির্বাসিত আজ প্রায় ৩২ বছর ধরে।
তবে তসলিমা খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাকে এক কাতারে ফেলেন সবসময়। আর এটা তিনি করেন একটা মানদণ্ডের ওপর। তাঁকে দেশে ঢুকতে না দেয়া। খালেদা জিয়াও দেননি, শেখ হাসিনাও নয়। ফলে তাঁর সমান ক্ষোভ দুই প্রধানমন্ত্রীর ওপরেই।
দেশে ফেরার পক্ষে তিনি বরাবর কথা বলে আসছেন। তবে দেশে ফিরতে দেয়া হলে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন কিনা সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। কারণ দেশ আরো অন্ধকার হয়েছে। মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ আরো প্রায় হয়েছে। যাই হোক, জন্মভূমিতে ফেরার অধিকার সকলেরই আছে।
শেখ হাসিনার বিষয়টি নিয়ে তসলিমা ফেসবুকে বেশ লম্বা একটি পোস্ট করেছেন।
সেখানে তিনি লিখেছেন:
১।শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চেয়েছেন। আমি তাঁর দেশে ফেরার অধিকারের পক্ষে শতভাগ। যদিও তিনি কখনও আমার দেশে ফেরার অধিকারের পক্ষে ছিলেন না, তবু আমি বিশ্বাস করি—একজন নাগরিকের অধিকার আছে নিজের দেশে নিরাপদে বাস করার। তিনি দেশে ফিরুন, নিরাপদে থাকুন, রাজনীতি করুন—এটাই গণতান্ত্রিক নীতি।
২। আওয়ামী লীগের যাঁরা দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁদেরও নিরাপদে দেশে ফেরার এবং নির্ভয়ে দেশে বাস করার অধিকার আছে। রাজনৈতিক মতভেদ বা ক্ষমতার পালাবদল কখনও নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার অজুহাত হতে পারে না।
তিন নাম্বারে তিনি লেখেন, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কথা। এই বিষয়ে প্রথম থেকেই তসলিমা সোচ্চার।
বলেন,
৩। আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিষেধাজ্ঞা, দমননীতি বা রাজনৈতিক প্রতিশোধ কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। জনগণই নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে কোন দল থাকবে, কোন দল প্রত্যাখ্যাত হবে।
৪। যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল জয়ী হন, তবে জনগণের রায় অনুযায়ী দেশ শাসনের অধিকার অবশ্যই তাঁদের থাকবে। গণতন্ত্রের অর্থই হলো—জনগণের সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া।
৫। ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রবলভাবে “জয় বাংলা”, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শের পক্ষে। আমি শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু আমি ডায়নাস্টি পলিটিক্স বা পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে নই।
কোনও রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্র একটি পরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে চলতে পারে না। গণতন্ত্রে নেতৃত্ব নির্ধারিত হওয়া উচিত যোগ্যতা, নীতি, সততা এবং জনআস্থার ভিত্তিতে—রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়”।
তসলিমা নাসরিন লিখেছেন,
“এই কারণেই আমি শেখ হাসিনার রাজনীতির সমর্থক নই। আমার বিশ্বাস, তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিপজ্জনকভাবে ধর্মকে ব্যবহার করেছেন, ইসলামী মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দিয়েছেন, এবং রাষ্ট্রকে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।
যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই বাংলাদেশকে তিনি ক্রমশ ধর্মীয় আপস, তোষণ এবং উগ্রতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন”।
৬। বাংলাদেশে আজ প্রয়োজন সৎ, সাহসী এবং সত্যিকারের সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতৃত্ব—যাঁরা রাষ্ট্র, সমাজ এবং শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে একটি আধুনিক মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলবেন। এমন নেতৃত্ব দরকার, যাঁরা নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপস করবেন না; বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, নারীর সমানাধিকার এবং মানবাধিকারের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধাশীল হবেন।
