ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শনিবার ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছবির প্রদর্শনী স্থগিত করা হয়েছে।
স্থানীয় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রত্যাহার এবং প্রশাসনিক অসহযোগিতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে জানিয়েছে আয়োজক সংগঠন।
জানা যায়, ঈদুল আজহা উপলক্ষে শনিবার (৩০ মে) বিকেল ৩টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছিল।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধিতা ছড়িয়ে পড়ে তীব্রভাবে। এবং এই নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত আয়োজনটি বাতিল করা হয়।
আয়োজক সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির এক ফেসবুক ঘোষণায় জানায়, স্কুলের কক্ষ ব্যবহারের প্রাথমিক অনুমতি থাকলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।
পাশাপাশি প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় প্রদর্শনী আয়োজন সম্ভব হয়নি বলে দাবি করে সংগঠনটি। তারা ভবিষ্যতে নতুন ভেন্যু নির্ধারণ করে পুনরায় প্রদর্শনীর তারিখ ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে।
ধর্মীয় পরিবেশ নাকি সিনেমা চললে নষ্ট হয়!? অথচ মাদ্রাসা, মসজিদে যে ধর্ষণ করা হয় প্রতিনিয়ত তখন বুঝি ধর্মীয় পরিবেশ রক্ষা হয়?
কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা হাফেজ নাসরুল্লাহ মুয়াজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া “আলেম-ওলামার শহর” এবং সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশ রক্ষায় এ ধরনের আয়োজন বন্ধ থাকা উচিত। তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপও দাবি করেন।
উল্লেখযোগ্য যে, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা সিনেমাটি প্রদর্শন না করার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা পোস্ট শুরু করে ।
ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুই নির্মাতা রেদওয়ান রনি ও আশফাক নিপুন।
রেদওয়ান রনি লিখেছেন, ‘শুধু “বনলতা এক্সপ্রেস” নয়, দেশের সব চলচ্চিত্রের জন্য এ ঘটনা চরম উদ্বেগজনক! আজ এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে অদূর ভবিষ্যতেই এটা চলচ্চিত্র উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হবে।

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেখক তসলিমা নাসরিন। ফেসবুকে তিনি বরাবরই সরব। বনলতা এক্সপ্রেসের ঘটনাতেও সর্ব হয়েছেন।
তিনি লেখেন,
“কওমী মাদ্রাসার ছেলেরা বনলতা এক্সপ্রেস নামের সিনেমাটি চলতে দেবে না ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। এতে অবাক হওয়ার কী হয়েছে? এই মূর্খ অশিক্ষিতরাই বাংলাদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের সংখ্যাই অধিক।
মাদ্রাসায় শিল্প সাহিত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয় না। বরং শিল্প সাহিত্যের বিরুদ্ধে, মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়। ছাত্ররা কোরান হাদিস পড়েই বড় হচ্ছে।
বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার, নারীর সমানাধিকার, মানবাধিকার সম্পর্কে কোনও জ্ঞান অর্জন করছে না। এদের একটা অন্ধকার জগতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই অন্ধকারের মানুষে ছেয়ে গেছে দেশের শহর বন্দর, গ্রাম গঞ্জ।
আরও সিনেমা, আরও থিয়েটার, আরও বই এরা চাইলেই বন্ধ করে দিতে পারে, কারণ এদের সংখ্যাই বেশি, এবং এরা শিখেছে কী করে মবসন্ত্রাস চালাতে হয়, কী করে সন্ত্রাসী হতে হয়, কী করে ধর্ষণ করতে হয়, কী করে মানুষকে অবলীলায় জবাই করতে হয়।
যখন এসব সন্ত্রাস সবে শুরু হয়, তখনই বন্ধ করে দিতে হয়। তা না হলে দেরি হয় যায়, সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র”।
তসলিমা আরো বলেন, “নব্বই দশকের শুরুতে মত প্রকাশের অধিকারের ওপর বিরাট আঘাত এসেছিল। তখন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ মজা দেখেছে, প্রতিবাদ করেনি। কওমী মাদ্রাসার এক শিক্ষক আমার মাথার ,মূল্য ঘোষণা করেছিল।
কেউ আমার মুণ্ডু কেটে নিয়ে তার হাতে দেবে, সে খুনীকে ৫০ হাজার টাকা দেবে। সরকার কি সেই ফতোয়াবাজ বদমাশকে তখন গ্রেফতার করেছিল? করেনি, বরং তার সন্ত্রাসী কীর্তিকলাপে এতই মুগ্ধ হয়েছিল যে তার কাছে সব রাজনৈতিক দল প্রস্তাব পাঠিয়েছিল তাদের দলে যোগ দেওয়ার জন্য, তাকে এমপিও বানিয়েছিল তারা।
দেশ জুড়ে মৌলবাদিরা আমার বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে মিছিল করছে দেখে সরকার ওই মূর্খ অশিক্ষিতদের খুশি করতে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। জনগণ কী করেছিল? মজা দেখেছিল, প্রতিবাদ করেনি।
এক এক করে সরকার আমার বই নিষিদ্ধ করলো। লজ্জা, আমার মেয়েবেলা, উতল হাওয়া, ক, সেই সব অন্ধকার। কেউ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কোনও কথা বলেছে?
কোনও শিল্পী, সাহিত্যিক, কোনও নাট্যকর্মী, সিনেমাওয়ালা, সিভিল সোসাইটির কেউ, কোনও প্রগতিশীল, কোনও বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, সমাজবিদ, রাজনীতিবিদ, কোনও নারীবাদী, মানববাদী? কোনও মানবাধিকার সংগঠন? না, কেউ করেনি। সবাই মজা দেখেছে।
মজা-দেখা-জনগণের দেশ মাদ্রাসার অশিক্ষিত মূর্খরা দখল করবেই তো, তারাই সিদ্ধান্ত নেবে মানুষ আদৌ বই পড়বে কিনা, নাটক সিনেমা দেখবে কিনা, গান গাইবে কিনা। মানুষ কী খাবে, কী পোশাক পরবে, কার সঙ্গে মিশবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কী কথা বলবে, সব সিদ্ধান্তই তারা নেবে, আর সরকার থাকবে চিরকাল তাদের গোলাম হয়ে, কারণ কিলবিলে সংখ্যার অনুকম্পা নিয়ে সরকারের ইচ্ছে অনন্তকাল ক্ষমতায় থেকে স্বর্গসুখ ভোগ করা”।
