ঢাকা: ভারতের আসাম রীতিমতো ডুবে গিয়েছে বন্যায়।

আসাম তার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে অন্তত ৬৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

ভারতের এই রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যার জলে প্লাবিত হওয়ায় গোটা শহর জলমগ্ন রয়েছে, হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অগণিত পরিবার দুর্ভোগের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং খনির কারণে দুর্যোগের মাত্রা আরও বেড়েছে, যা পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছে আসামের শিবসাগর জেলার।

অসমের শিবসাগর জেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে প্লাবিত একাধিক এলাকা। বিভিন্ন এলাকা ভেসে যাওয়ার কারণে ইতিমধ্যে সাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জেলা জুড়ে।

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘরে ঢুকে পড়ছে বিষাক্ত সাপগুলি।

আকস্মিক বন্যায় শিবসাগর জেলার হলাং কাটনি গ্রামের বাসিন্দা রেখামণি গগৈ ও তার সাত বছর বয়সী ছেলে টানা ১২ ঘণ্টা একটি আমগাছে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বাঁচেন। এইভাবে মানুষ গাছে উঠে আছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, ১৯ জুলাই প্রবল বর্ষণের পর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের গ্রামে বুক সমান পানি উঠে যায়। প্রথমে তিনি পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

কিন্তু সেখানেও পানি বাড়তে থাকায় সন্ধ্যা প্রায় আটটার দিকে বাড়ির উঠোনের একটি বড় আমগাছে উঠে যান।

সরকার তো বটেই, আসামের সাধারণ মানুষ যে যেভাবে পারছে সাহায্য করছে।

আসামে ক্রমাগত ভারী বৃষ্টিপাত ও ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় রাজ্যজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (ASDMA) বরাত দিয়ে জানা গেছে, শিবসাগর, চরাইদেও, গোলাঘাট, যোরহাট ও নগাঁও জেলাসহ একাধিক জেলায় প্রায় ৬ লক্ষ মানুষ এখনো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছেন।

বহু গ্রাম এখনো সম্পূর্ণরূপে পানির নিচে ডুবে আছে, রাস্তাঘাট, সেতু ও বাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। হাজার হাজার পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পড়ে আছেন।

কাদা-মাখা ঘরবাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট, নষ্ট হয়ে যাওয়া গৃহস্থালি সামগ্রী এবং জলমগ্ন ফসলের মাঠ—সব মিলিয়ে হাজার হাজার পরিবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই করছে।

জেলা প্রশাসনের মতে, গত প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।

বন্যাদুর্গত বেশ কয়েকটি গ্রামে বাসিন্দারা তাদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করতে এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা উদ্ধারের কাজ শুরু করেছেন।

তবে অনেক পরিবারেরই আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই; ঘরে পানি ঢুকে খাদ্যশস্য, আসবাবপত্র, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নষ্ট করে দিয়েছে।

ত্রাণ তৎপরতা সত্ত্বেও অনেক এলাকায় নিরাপদ পানীয় জল, ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানান, দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে ভারতীয় বায়ুসেনার হেলিকপ্টারের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই অসমে পৌঁছে বন্যায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন শুরু করেছে।

হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ঘোষণা করেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দুই লক্ষ মহিলাকে একটি করে মেখেলা-চাদর এবং দুই লক্ষ শিশুকে টি-শার্ট ও প্যান্ট দেওয়া হবে।

এই কর্মসূচির জন্য প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা বিজেপির কর্মীদের স্বেচ্ছা অনুদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।

শিবসাগর ও চরাইদেও জেলার বহু স্কুলে কাদা ও পলি জমে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত পরিষ্কার ও সংস্কারের জন্য স্কুলগুলিকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *