ঢাকা: ভারতের কলকাতা যাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন তসলিমা নাসরিন। এখন থেকে সেখানে যেতে আর কোনো বাধা নেই। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মঞ্চে খোদ ঘোষণা করেছেন, তসলিমার নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের।
এবার কলকাতায় বেশ সময়সূচি মেনে চলতে হয়েছে লেখককে। কর্মসূচি ছিলো।ফলে নিজের মনের মতো করে প্রাণের শহরটা দেখতে পারেননি। তবে পরের বার দেখতে চেয়েছেন।
তিনি ফেসবুকে লেখেন:
“এবারের কলকাতা সফরে সবচেয়ে বেশি পেয়েছি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। বিমানবন্দর, রবীন্দ্রসদন, কফি হাউস, পানিহাটি, হোটেল—যেখানেই গিয়েছি, মানুষ অপেক্ষা করেছেন।
কেউ দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন, কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছেন—শুধু একবার আমাকে দেখবেন, একটু কথা বলবেন অথবা একটি ছবি তুলবেন বলে।
সন্ধ্যা ভৌমিক এসেছিলেন ঝাড়খণ্ড থেকে, শুধু আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। সঙ্গে এনেছিলেন গাছের ফল, নিজের হাতে বানানো একটি ব্যাগ আর একরাশ ভালোবাসা।
ফলের সঙ্গে যেন তাঁর মাটির গন্ধ লেগে ছিল, ব্যাগের প্রতিটি সেলাইয়ে ছিল তাঁর মমতা। একজন পাঠকের ভালোবাসা যখন এতটা পথ পেরিয়ে আসে, তখন তা আর শুধু উপহার থাকে না—স্মৃতি হয়ে যায়।
সবার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। অনেকের মুখ দেখেছি, কিন্তু কাছে যেতে পারিনি। অনেকে রবীন্দ্রসদনের বাইরে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন; আমন্ত্রণপত্র বা প্রোটোকলের কারণে ভেতরে ঢুকতে পারেননি। ভেতরে চেয়ার খালি ছিল, বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষ—এই দৃশ্যের কথা মনে হলে এখনও কষ্ট হয়।
যাঁরা এত ভালোবেসে এসেও আমার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি, তাঁরা যেন আমাকে ভুল না বোঝেন। তাঁদের এড়িয়ে যাইনি।
সফরের প্রতিটি দিন অনুষ্ঠান, সাক্ষাৎকার, যাতায়াত এবং নিরাপত্তার সময়সূচিতে এমনভাবে বাঁধা ছিল যে নিজের ইচ্ছেমতো সামান্য সময়ও বের করতে পারিনি। আপনাদের ভালোবাসা আমি দেখেছি, অনুভব করেছি এবং সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি”।
নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেন, “আরও কত কিছু করার ইচ্ছে ছিল! গঙ্গায় নৌকো নিয়ে ঘুরব, কোনও এক সন্ধ্যায় মঞ্চনাটক দেখব, নন্দনে সিনেমা দেখব, রবীন্দ্রসংগীত শুনব, সময় পেলে টুক করে শান্তিনিকেতন ঘুরে আসব।
কোনও উদ্দেশ্য ছাড়াই কিছুটা পথ হাঁটব। যাঁদের সঙ্গে এবার দেখা হয়নি, তাঁদের সঙ্গে বসে গল্প করব। কিছুই হলো না।
একটি শহরকে শুধু মঞ্চ, সংবর্ধনা আর সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে ছোঁয়া যায় না।
তাকে ছুঁতে হয় তার শিল্প, সাহিত্য, গান, নাটক, সিনেমা ও দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে প্রবেশ করে; তার মানুষের পাশে বসে। আমি কলকাতায় শুধু অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে নয়, একজন সাধারণ দর্শক, শ্রোতা ও পাঠক হয়েও ফিরতে চাই।
এবার কলকাতার মানুষ আমাকে দেখতে এসেছেন; পরের বার আমি কলকাতাকে দেখতে চাই।
পরের বার, কলকাতা, এত আয়োজনের ফাঁকে আমার জন্য একটু অবসরও রেখো—তোমার মঞ্চে নাটক দেখার, নন্দনে সিনেমা দেখার, তোমার গান শোনার, গঙ্গায় ভাসার, শান্তিনিকেতনের পথে বেরিয়ে পড়ার এবং তোমার মানুষের পাশে বসার অবসর। আমি আবার আসব”।
