ঢাকা: বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ককে নৈতিক অধঃপতন বলা যাবে না। রায় দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্ট।
এই রায়কে সমর্থন করে ফেসবুকে পোস্ট করলেন নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিন।
তসলিমা নাসরিন তাঁর পোস্টে লিখেছেন, অনেক দেরিতে হলেও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অবশেষে স্বীকার করেছে যে দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিসূচক সম্পর্ককে অপরাধ বা খারাপ চরিত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। তাঁর মতে, একটি সম্পর্কের আসল ভিত্তি হলো ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং সম্মতি। শুধুমাত্র একটি বিবাহের সনদ কোনও সম্পর্কের সাফল্য বা স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্যকে স্বাগত জানান তসলিমা।
তিনি মনে করেন, “বিয়ের সনদপত্র নয়, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাই সম্পর্কের ভিত্তি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণাই সমাজে প্রচলিত যে বিয়েই সম্পর্কের একমাত্র বৈধ রূপ। কিন্তু আমরা তো সকলেই জানি যে অসংখ্য মানুষ বিয়ে করে অসুখী জীবন কাটায়, আবার অনেকে বিয়ে ছাড়াই দীর্ঘকাল সুখী ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখে”।
তসলিমা লেখেন, “আমার মনে হয়, একসঙ্গে না থাকলে একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে জানা যায় না। দৈনন্দিন জীবন, অভ্যাস, রাগ, অসহিষ্ণুতা, দায়িত্ববোধ, ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান—এসব বোঝা যায় একত্রবাসে। তাই কেউ যদি বিয়ে করতে চায়, তাহলে বিয়ের আগে একসঙ্গে থাকাটা খুবই জরুরি। এতে দুজন মানুষ বুঝতে পারেন তাঁরা আদৌ একসঙ্গে জীবন যাপন করতে পারবেন কি না।
ব্যক্তিগতভাবে আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে পৃথকবাসের ধারণাকেও মূল্য দিই। দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসতে পারেন, ঘনিষ্ঠ হতে পারেন, একে অপরের বাড়িতে সময় কাটাতে পারেন, অথচ নিজের স্বাধীন বাসস্থান ও ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখতে পারেন।
সব সম্পর্কের লক্ষ্য একই ছাদের নিচে থাকা হতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেক মানুষের জন্য স্বাধীনতা ও ঘনিষ্ঠতার এই ভারসাম্যই সবচেয়ে সুখী ও স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে”।
তসলিমা আরো ভাবেন, “আমি আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে ভাবি—বিয়ে একটি অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। একসময় বিয়ের প্রয়োজন ছিল—বিশেষত নারীরা যখন আর্থিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, যখন সামাজিক নিরাপত্তা ছিল না, যখন সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি আইনি কাঠামো দরকার ছিল।
কিন্তু আধুনিক সমাজে দুজন স্বাধীন, স্বনির্ভর প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মতির জন্য বিয়ের সনদের প্রয়োজন নেই। ভালোবাসা থাকলে সম্পর্ক টিকে থাকবে, ভালোবাসা না থাকলে বিয়ের কাগজও সম্পর্ককে বাঁচাতে পারবে না। বরং বিয়ে অনেক সময় ভালোবাসার
স্বেচ্ছাসম্মত সম্পর্ককে সামাজিক ও আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করে।
তসলিমা অন্যরকম সমাজের কল্পনা করেন। তিনি লেখেন, “আমি এমন এক সমাজ কল্পনা করি, যেখানে ভালোবাসা, সম্মতি ও সমতাই সম্পর্কের ভিত্তি হবে, বিয়ের প্রতিষ্ঠান নয়।
অবশ্যই কেউ যদি বিয়ে করতে চান, করবেন। বিয়ে করার অধিকার তাঁর আছে। আবার কেউ যদি লিভ-ইন সম্পর্কে থাকতে চান, তাও তাঁর অধিকার। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে নৈতিক পুলিশিং করা নয়, রাষ্ট্রের কাজ মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করা।
সুপ্রিম কোর্টের এই অবস্থান সমাজকে হয়তো কালই বদলে দেবে না। কিন্তু ইতিহাসে প্রায় সব সামাজিক পরিবর্তনই প্রথমে আইনের মাধ্যমে, তারপর ধীরে ধীরে মানুষের মননে জায়গা করে নিয়েছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, সম্মতি এবং সমতার ধারণাও সেই পথেই এগিয়েছে। এই রায় সেই দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ”।
