পর্ব-২

এবার একটু বাংলাদেশ-ভারত, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের তুলনামূলক অপরাধ-হত্যা, সীমান্তপথ সেসব একটু বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী- গত দুই বছরে (২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত) বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও বাহিনীর গুলিতে এবং মাইন বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।

একই সময়ে জেলে অপহরণ ও সীমান্তে অনুপ্রবেশের জেরে কয়েক ডজন বাংলাদেশি নাগরিককে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে আলোচনার মাধ্যমে।

পর্ব-১ পড়ার জন্য লিংকে ক্লিক করুন: 

https://sonar-bangla24.com/opinion/the-devils-group-keeps-the-bangladesh-india-myanmar-border-problem-alive/19035/

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তে মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টার শেল ও গুলিতে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি আহত হন এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাইক্ষ্যংছড়ির হেডম্যানপাড়া সীমান্তে ল্যান্ডমাইনের আঘাতে এক বাংলাদেশি যুবক তার একটি পা হারান।

২০২৪ সালের আগষ্টে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে লড়াইয়ের সময় সীমান্তে প্রাণ বাঁচাতে অপেক্ষারত রোহিঙ্গাদের ওপর ড্রোন হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে।

এ সময় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও কয়েকজন মারা গেছে ও বেশ কিছু আহত হয়।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত নাফ নদী তীরে ও জিরো লাইন এলাকায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে প্রায়শই বাংলাদেশের নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। যার অধিকাংশ নিউজ মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়না।

সাম্প্রতিক সময়ে ২৪ মে ২০২৬ সালেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে ৩ জন বাংলাদেশি কৃষক প্রাণ হারিয়েছেন।

২০২৪ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে ১৩ জন বাংলাদেশি জেলে অপহৃত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

২০২৪ সালের এপ্রিলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কারাবন্দি ও নাগরিকত্ব যাচাই হওয়া ১৭৩ জন বাংলাদেশি নাগরিককে নৌপথে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

২০২৬ সালের মে মাসে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলে অপহরণের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও, পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে এদের বেশিরভাগই মুক্তি পান।

যেমন ২০২৬ সালের মে মাসে আরাকান আর্মি ১৪ জন বাংলাদেশি নাগরিককে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর কাছে হস্তান্তর করে।

তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে প্রায়ই বিচ্ছিন্নভাবে হতাহত ও সীমান্ত লঙ্ঘনের মতো ঘটনাগুলো ঘটছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে, তার মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশই নদীপথ।

মানে ওই সীমান্তের মধ্যে ৬৪ কিলোমিটার ধরে দুই দেশের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া নাফ নদীটাই যেন আন্তর্জাতিক সীমান্ত।

স্থল ও নদীর এই সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী চোরাকারবারী, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ী-মানব পাচারকারিদের দৌরাত্ম্য চলছে। যদিও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী প্রায়শই এসব জঙ্গী রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। এ অভিযানে বেশ কিছু নিহত ও আহতের ঘটনা ঘটে। কিন্তু তা কোন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়না বাংলাদেশে।

আর বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে আসা কয়েকলাখ রোহিঙ্গাদের নিয়ে দেশে ও বিদেশে নানা আন্তর্জাতিক চক্র অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে যাতে এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আর মিয়ানমারে ফেরত না যায়।

কারণ এই রোহিঙ্গাদেরকে পুঁজি করে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা মানবাধিকার ব্যবসার ফাঁদ পেতেছে। এক্ষেত্রে তাদের পালের গোদা হচ্ছে ইউএনএইচসিআর বা ইউনাইটেড ন্যাশনস হাইকমিশনার ফর রিফিউজি।

এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি কখনোই চায়না এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমস্যার সমাধান হোক। কারণ এর সাথে লাখ লাখ ডলারের লেনদেনের বিষয় রয়েছে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের।

এই ইউএনএইচসিআরের অধীনে দেশি বিদেশী অসংখ্য এনজিও রয়েছে যারা এই রোহিঙ্গাদের অমানবিক জীবনযাত্রাকে পুঁজি করেই টিকে আছে।

মানে এসব এনজিওর মূল ব্যবসা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের অমানবিক জীবনযাত্রা। এই রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে ইসলামী দেশগুলোর বেশ কিছু এনজিও বেশ সক্রিয় রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইসলামী দেশ, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ নানাভাবেই তাদের তৎপরতা-অপতৎপরতা চালাচ্ছে অনেকবছর ধরে।

অপতৎপরতা বলছি এজন্য যে, এসব অধিকাংশ ইসলামী এনজিও নানা নামে রোহিঙ্গাদেরকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, জঙ্গী প্রশিক্ষণ, মাদক-নারী পাচার ও আদম পাচারের কাজে লিপ্ত করে থাকে।

বাংলাদেশে গত কয়েকবছর যাবৎ এমন অনেক এনজিও’র বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে; ইসলামী রোহিঙ্গা জঙ্গীদের নানা ধরনের সহায়তায় তা অস্ত্র গোলাবারুদ সংগ্রহে হোক, প্রশিক্ষণে হোক , মাদক চোরাকারবারে হোক বা মানব পাচারের কাজে হোক।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা মীর কাসেম আলী একসময়ে ‘ রাবেতা আল ইসলামী’ নামে একটি এনজিও’র বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিলেন। এটি মূলত সৌদি সাহায্যপুষ্ট একটি এনজিও।

কিন্তু এই এনজিওটি রোহিঙ্গাদের জঙ্গী সংগঠন আরএসও, এআরএনওসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের সশস্ত্র ট্রেনিংয়ের কাজে সহায়তা করে থাকে।

মীর কাসেম আলী যেহেতু জামায়াতের মূল অর্থ যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, শুধু তাই নয় এই মীর কাসেম আলী ছিলেন চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধকালীন আলবদর বাহিনীর প্রধান কমান্ডার।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই মীর কাসেম আলী ও তাদের আলবদর বাহিনীর নির্মম নির্দয় পৈশাচিক অত্যাচার নির্যাতনে অনেক মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিকামী বাঙ্গালী যাদের মধ্যে অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী হত্যার শিকার হয়েছেন। অকাতরে প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। অনেক নারী তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন।

চট্টগ্রামে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের নন্দনকানন এলাকার পুরাতন টেলিগ্রাফ রোডে একটি হোটেল ছিল যার নাম মহামায়া ডালিম হোটেল।

যেটিকে এই মীর কাসেম আলী তার অত্যাচারের বা টর্চার সেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এই মীর কাসেম আলীই ছিলেন সেই রাবেতা আর ইসলামীর বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর।

এই রাবেতা আল ইসলামী এনজিও বা সাহায্য সংস্থার আড়ালে জামায়াত-শিবির ও রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গী সংগঠনগুলোকে সামরিক ও অস্ত্রের ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা করতো।

এমন আরো অনেক এনজিও রয়েছে যারা এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে গত চব্বিশের জুলাই-আগষ্টের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বেশ কিছু ইসলামী এনজিও, তুরষ্কের কয়েকটি এনজিও নানাভাবেই ইসলামী জঙ্গীদের ব্যবহার করেছে আওয়ামীলীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে।

এমনকি এমন অভিযোগও রয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব ইসলামী জঙ্গী স্নাইপারদেরকে নাশকতার কাজে লাগানো হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নানা অপরাধের বিরুদ্ধে কক্সবাজার-বান্দরবান ও চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষজন বিরক্ত ও সোচ্চার হয়ে উঠলেও তাদের বিরুদ্ধে খুব বেশি কিছু করতে পারছেনা। কারণ আন্তর্জাতিক নানা মহল থেকে আবার বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

বিগত ইউনুসীয় শাসনামলে এই রোহিঙ্গাদের নিয়ে নানা ধরনের খেলা খেলেছে আমেরিকা-তুরস্ক, জাতিসংঘসহ আরো অনেকে। এদেরকে নিশ্চিত করে আবার মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ‘নোবেল লরিয়েট’ ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

কিন্তু সেই ‘ শান্তির দূত’ ইউনূস যে জনগণের সাথে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করেছেন তার প্রমাণ দেখতে পেয়েছি সবসময়। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।

এবার একটু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতির বিষয়টি দেখে আসি।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন—এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা যান।

আগের বছরগুলোতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২০২৪ সালে ৩০ জন। তবে কি কারণে বা কোন প্রেক্ষিতে তারা মারা গিয়েছে তার বিবরণ পাওয়া যায়নি।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে আরও অন্তত ৩৮ জন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার হন এবং ১৪ জনকে বিএসএফ অপহরণ করে, যাদের মধ্যে মাত্র চারজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

চলতি বছরের মে মাসে ভারত সীমান্তে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গত ১৪ মে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে খাদেমুল হক নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন।

এর আগে ১১ মে ত্রিপুরা সীমান্তে ‘ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ অভিযোগে বিএসএফের গুলিতে দুইজন নিহত হন।

এছাড়া ৮ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আরও দুই বাংলাদেশি নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী দেশ। উভয় দেশকেই প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে হবে। দুই দেশের জনগণের একাংশের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য সীমান্ত পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলছে।

তাঁর মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক না থাকলে সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

একই সঙ্গে তিনি সীমান্ত হত্যা বন্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, যৌথ তদন্ত ব্যবস্থা, সীমান্ত এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিজিবি-বিএসএফের জবাবদিহি বৃদ্ধি, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার এবং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এবার যদি আমরা মিয়ানমার-বাংলাদেশ ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যা বা নির্যাতনের বিষয়গুলোর ব্যাপারে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি তাহলে বুঝতে পারবো সত্যিকার অবস্থা।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কিছু একটা হতে না হতেই বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো ভারতকে আগ্রাসী-মানবতাবিরোধী-সীমান্তে মানুষ হত্যাকারি দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করে গলা ফাঠিয়ে ফেলতে দেরি করেনা।

আর সেই সাথে জঙ্গী আদিলুর রহমানের “অধিকার”, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালদেরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র মানে আসক সহ বেশ কয়েকটি মানবাধিকার দোকানদার বা এনজিও সমস্বরে তোলপাড় করে ফেলে নানা তথ্য-উপাত্ত প্রচার করে। আর বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়াতে এসব তথ্য সোৎসাহে প্রচার করে থাকে।

বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের স্থল সীমান্ত রয়েছে ২০৭ কিলোমিটার। আর নাফ নদীর বিভক্তিকরণের মধ্য দিয়ে সীমানা রয়েছে ৬৪ কিলোমিটার। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার স্থল সীমান্ত রয়েছে ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার।

আমরা যদি স্থল সীমান্তপথ হিসেব করি তাহলে দেখবো যে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তের অন্তত ২০ গুণেরও বেশি সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে। আর পারস্পরিকভাবে এই দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগও বেশি সঙ্গত কারণেই।

যেসব পরিসংখ্যান আমাদের হাতে রয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে গত দুই বছরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে গুলি ও মাইন বিস্ফোরনের ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়েছে।

তারমানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের ২০৭ কিলোমিটার সীমান্তে নিহত হয়েছে ১০ জন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেকার ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তে গত দুই বছরে মারা গেছে ৬৪ জন।

আমরা যদি সীমান্তের দৈর্ঘ্য ও মারা যাওয়ার প্রেক্ষপট বিচার বিশ্লেষণ করি তাহলে কিন্তু একটু ভিন্ন চিত্রই চোখে পড়বে। মিয়ানমারের মাইন বিষ্ফোরণ বা মিয়ানমারের সীমান্তবাহিনী বা তাদের ছোড়া রকেট হামলা ও ড্রোন হামলায় নিহত ও আহতদের ব্যাপারে কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলকে এসব হত্যাকান্ড বা হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে দেখিনা। আর তখন কিন্তু ইসলামীদলগুলোর বীর পুঙ্গবরা রাস্তায় জঙ্গী মিছিল বের করে মিয়ানমার দখল বা রেঙ্গুন এমনকি মংডু দখলেও কোন হুমকি ধামকিতো দূরের কথা কোন টু শব্দটি করতে দেখিনা।

এই যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে মিয়ানমারের বৌদ্ধ সামরিক যান্তা অত্যাচার নির্যাতন করছে, মেরেছে, তাদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে তখন কিন্তু এদেশের ইসলামী দলগুলেঅর ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ বা ইসলামী বিপ্লবের চেতনা চেতিত হয়নি।

তখন তাদের ইমানী দন্ড চেতিত হয়নি। তখন আর তাদের ইসলামী মানবতাবোধ জাগ্রত হয়না।

কারণ তারা জানে যে মিয়ানমারের পেছনে চীনসহ আরো কয়েকটি শক্তিশালী দেশ রয়েছে। তাই সেখানে যতই মুসলিম নির্যাতন, নারী নির্যাতন হোক না কেন তখন তাদের ইসলামী চেতনা হিমালয়ের বরফে
ঢাকা পড়ে থাকে হিমশীতল পরিবেশে।

কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কোন অস্ত্র-মাদক চোরাকারবারি নিহত বা অঅহত হলে তখন কিন্তু এসব ইসলামী দলগুলোর ইসলামী চেতনা থেকে আগ্নেয়গিরির লাভা বের হতে থাকে। তখনই পারলে তারা ভারত দখল করে এর উপযুক্ত জাবাব দেয় এমনই ভাব আর কি !

মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে ১০ জন নিহত হয়েছে ২০৭ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্তে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটা দীর্ঘ সীমান্তে মারা গেছে ৬৪ জন। আমরা চাইনা সীমান্তে কোন হত্যাকান্ড হোক।

কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তের তুলনামূলক বিচার ও মৃত্যুর পরিসংখানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মৃত্যুর হার অনেক কম। যদি কিলোমিটারের হিসেবে ধরি তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অন্তত ২০০ জনের মৃত্যু হওয়ার কথা ছিল।

এমন যুক্তি যদি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তুলে ধরে তার কি কবাব দেবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ? স্বাভাবিকভাবেই পরিসংখ্যান একটি বড় বিষয় বটেই। কারণ এসব দিয়েই তো নানামুখী রাজনীতি হচ্ছে এতদিন।

সেক্ষেত্রে গত দুই বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মারা গেছে ৬৪ জন। মিয়ানমার-বাংলাদেশের তুলনায়তো অনেক কম।
তবে আমরা কোন দেশের সঙ্গেই কোন সীমান্ত বিরোধ চাইনা।

শান্তিপূর্ণ সীমান্ত অবস্থান চাই প্রতিবেশি দেশগুলোর মধ্যে। কিন্তু সেজন্যতো যুক্তি-তর্ক ও বাস্তব পরিস্থিতি মানতে হবে। তা না করে মিয়ানমার আমাদেরকে মারতে মারতে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেও “ স্পিকটি নট” নীতি মানে নতজানু পররাষ্ট্র নীতি অবলম্বন করবো।

আবার ওদিকে যদি ভারত সীমান্তে একটু ফুটুস ফাটুস হয় তাহলেই একেবারে ইসলামী জোশ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বো, ভারতীয় দূতাবাসে হামলে পড়বো, কলকাতা-দিল্লী ও সেভেন সিস্টার্স দখলের হম্বি-তম্বি করে একেবারে বীরত্ব ফলাতে যাবো এমন বৈপিরীত্য অবশ্যই পরিহার করা উচিত।

তা যদি না হয়, তাহলে বাংলাদেশ যতই সৎ প্রতিবেশিসুলভ আচরণের আশা করুক না কেন তা কি করে পাবে? কারণ ওই যে কথায় বলেনা- “আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও” সেই বিষয়টি আমাদের অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজন।

# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *